মোঃ মিনারুল ইসলাম
চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদা উপজেলায় আজ এক রুদ্ধশ্বাস পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল। একদিকে চলছিল একটি কিশোরীর বিয়ের ধুমধাম আয়োজন, আর অন্যদিকে গোপনে খবর পেয়ে আসরে হাজির হলো প্রশাসন। শেষ পর্যন্ত বিয়ের সানাই থামিয়ে দিয়ে বাল্যবিবাহের হাত থেকে রক্ষা করা হলো এক অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েকে। শুক্রবার দুপুরে উপজেলার জুড়ানপুর ইউনিয়নের রামনগর নতুনপাড়া গ্রামে এই ঘটনাটি ঘটে। প্রশাসনের এই ঝটিকা অভিযানে কেবল বিয়েই বন্ধ হয়নি, বরং জড়িতদের গুনতে হয়েছে মোটা অঙ্কের জরিমানা। এই ঘটনাটি পুরো এলাকায় বেশ চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে এবং বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে একটি কড়া বার্তা পৌঁছে দিয়েছে।
ঘটনার বিস্তারিত জানা যায় স্থানীয় সূত্রে। আজ ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, শুক্রবার ছিল বিয়ের নির্ধারিত দিন। রামনগর নতুনপাড়া গ্রামে ওই কিশোরীর বাড়িতে সকাল থেকেই ছিল উৎসবের আমেজ। বাড়ির আঙিনায় সামিয়ানা টাঙানো হয়েছে, রান্নার তদারকি চলছে পুরোদমে। ১০০% প্রস্তুতি শেষ করে যখন বরপক্ষের আগমনের অপেক্ষায় ছিল কনের পরিবার, ঠিক তখনই সেখানে হানা দেয় উপজেলা প্রশাসনের একটি বিশেষ দল। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে তারা জানতে পারেন যে, বর ও কনে দুজনের বয়সই বিয়ের জন্য আইনত বৈধ নয়। বিশেষ করে কনেটি এখনও কৈশোর পার করেনি। এমন খবর পাওয়ার সাথে সাথেই দামুড়হুদা উপজেলা প্রশাসন কোনো বিলম্ব না করে ঘটনাস্থলে পৌঁছে যায়।
দুপুর ১টার দিকে যখন বিয়ের ভোজের প্রস্তুতি চলছে, তখনই সেখানে হাজির হন দামুড়হুদা উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট মো. শাহীন আলম। তাঁর সাথে ছিল চুয়াডাঙ্গা জেলা পুলিশ ও আনসার সদস্যদের একটি চৌকস দল। ম্যাজিস্ট্রেট আসার খবর শুনে মুহূর্তের মধ্যে আনন্দঘন পরিবেশে নেমে আসে নীরবতা। বিয়ের প্যান্ডেলে উপস্থিত আত্মীয়-স্বজনদের মধ্যে শুরু হয় হুড়োহুড়ি। প্রাথমিক অনুসন্ধানে ম্যাজিস্ট্রেট নিশ্চিত হন যে, কনের বয়স বিয়ের জন্য উপযুক্ত নয় এবং এটি সরাসরি বাল্যবিবাহ নিরোধ আইনের লঙ্ঘন। এরপর তিনি সেখানে তাৎক্ষণিকভাবে একটি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেন।
আদালত পরিচালনার সময় দেখা যায়, কনের মা এবং বরের মামা এই বিয়ের আয়োজনে সরাসরি জড়িত এবং তারা আইন অমান্য করে এই আয়োজন করেছেন। দোষ স্বীকার করায় ভ্রাম্যমাণ আদালত বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন, ২০১৭-এর বিভিন্ন ধারা অনুযায়ী তাদের অপরাধ বিবেচনা করেন। অপরাধের গুরুত্ব বুঝে আদালত মেয়ের মা এবং ছেলের মামাকে মোট ১০,০০০ (দশ হাজার) টাকা অর্থদণ্ড প্রদান করেন। বর্তমান বাজার দরে এই জরিমানার পরিমাণ প্রায় ৮৫ মার্কিন ডলারের ($৮৫) সমান। টাকা আদায়ের পাশাপাশি প্রশাসনের পক্ষ থেকে কড়া নির্দেশ দেওয়া হয় যেন অবিলম্বে সব আয়োজন বন্ধ করা হয়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল কিশোরীটির ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা। জরিমানা আদায়ের পর ম্যাজিস্ট্রেট অভিযুক্ত ব্যক্তিদের কাছ থেকে একটি লিখিত মুচলেকা গ্রহণ করেন। সেখানে পরিবারের সদস্যরা ১০০% নিশ্চয়তা দিয়ে সই করেন যে, মেয়েটির বয়স ১৮ বছর পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত তারা কোনোভাবেই তাকে বিয়ে দেবেন না। এমনকি তার পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার বিষয়েও তারা অঙ্গীকার করেন। ম্যাজিস্ট্রেট শাহীন আলম উপস্থিত সবার উদ্দেশ্যে বলেন, “বাল্যবিবাহ একটি সামাজিক ব্যাধি। এটি কেবল একটি মেয়ের জীবন ধ্বংস করে না, বরং একটি পুরো পরিবারের স্বপ্ন ভেঙে দেয়। আমরা এই উপজেলাকে বাল্যবিবাহ মুক্ত করতে ১০০% বদ্ধপরিকর।”
পুলিশ ও প্রশাসনের এমন কঠোর অবস্থানে এলাকার সাধারণ মানুষ ও সচেতন মহল বেশ সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। গ্রামের এক প্রবীণ বাসিন্দা বলেন, “আমরা অনেক সময় বুঝতেই পারি না যে অল্প বয়সে বিয়ে দেওয়া কতটা বড় অপরাধ। আজ ম্যাজিস্ট্রেট সাহেব এসে আমাদের চোখ খুলে দিয়েছেন।” আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা জানান, পুরো অভিযান চলাকালীন স্থানীয়রা তাদের সাথে চমৎকার সহযোগিতা করেছেন। কোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি ছাড়াই এই অভিযান সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। জরিমানা থেকে প্রাপ্ত অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হয়েছে বলে প্রশাসন নিশ্চিত করেছে।
দামুড়হুদা উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানানো হয়েছে, চুয়াডাঙ্গা জেলায় বাল্যবিবাহের হার কমিয়ে আনতে তারা নিয়মিত কাজ করে যাচ্ছেন। সরকারের লক্ষ্য হলো ২০৩০ সালের মধ্যে এই হার ০% এ নামিয়ে আনা। বর্তমান প্রেক্ষাপটে প্রশাসনের এমন তৎপরতা গ্রামীণ মানুষের মধ্যে আইন মেনে চলার প্রবণতা বাড়াবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। অভিযান শেষে ম্যাজিস্ট্রেট উপস্থিত লোকজনকে বাল্যবিবাহের কুফল সম্পর্কে সচেতন করেন এবং ভবিষ্যতে এমন কোনো আয়োজন দেখলে সাথে সাথে প্রশাসনকে জানানোর পরামর্শ দেন।
বিকেল নাগাদ রামনগর গ্রামের সেই বাড়িতে বিয়ের সাজগোজ খুলে ফেলা হয়। যেখানে আনন্দের উৎসব হওয়ার কথা ছিল, সেখানে এখন বিরাজ করছে এক শিক্ষণীয় নীরবতা। স্থানীয়রা বলছেন, ১০ হাজার টাকার জরিমানা হয়তো পরিবারের জন্য কষ্টের, কিন্তু একটি মেয়ের জীবন নষ্ট হওয়ার হাত থেকে রক্ষা পাওয়া তার চেয়ে অনেক বেশি দামি। প্রশাসনের এই সময়োপযোগী পদক্ষেপের কারণে আজ একটি জীবন বেঁচে গেল অন্ধকারের হাত থেকে। উপজেলা প্রশাসন ভবিষ্যতে এই ধরনের অভিযান আরও জোরদার করবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে।
















