ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলায় বর্তমান সময়ের সবচেয়ে আলোচিত তিনটি সামাজিক সমস্যা মাদক, বাল্যবিবাহ এবং ইভটিজিং প্রতিরোধের লক্ষ্যে এক বিশাল অভিভাবক সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) সকাল ১১টার দিকে উপজেলার নাগিরাট মকরামপুর দাখিল মাদ্রাসা প্রাঙ্গণে এই সচেতনতামূলক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। মাদ্রাসার শিক্ষার্থী, শিক্ষক এবং এলাকার কয়েকশ অভিভাবকের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠানটি এক বিশাল জনসভায় পরিণত হয়। অনুষ্ঠানের মূল উদ্দেশ্য ছিল অভিভাবকদের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করা, যাতে তাঁরা তাঁদের সন্তানদের সঠিক পথে পরিচালিত করতে পারেন এবং একটি সুন্দর সমাজ বিনির্মাণে ভূমিকা রাখতে পারেন।
অনুষ্ঠানে প্রধান আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন শৈলকুপা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মাহফুজুর রহমান। তিনি তাঁর বক্তব্যে অত্যন্ত সহজ ভাষায় মাদকের মরণনেশা এবং বাল্যবিবাহের কুফল তুলে ধরেন। পরিসংখ্যান তুলে ধরে তিনি বলেন, বর্তমান সময়ে দেশের যুবসমাজের একটি বড় অংশ, প্রায় ২৫% থেকে ৩০%, কোনো না কোনোভাবে মাদকের সাথে জড়িয়ে পড়ছে। এটি কেবল একটি জীবন ধ্বংস করছে না, বরং একটি পরিবারকেও আর্থিক ও মানসিকভাবে পঙ্গু করে দিচ্ছে। মাদকের টাকা জোগাড় করতে গিয়ে অনেক কিশোর-কিশোরী অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে। তিনি অভিভাবকদের সতর্ক করে বলেন, আপনার সন্তান কার সাথে মিশছে এবং কোথায় সময় কাটাচ্ছে, তা দেখার দায়িত্ব ১০০% আপনার।
বাল্যবিবাহ প্রসঙ্গে ইউএনও বলেন, শৈলকুপার গ্রামীণ এলাকাগুলোতে এখনও সুযোগ বুঝে অনেকে অপ্রাপ্ত বয়সে মেয়েদের বিয়ে দিয়ে দিচ্ছেন। চিকিৎসকদের মতে, বাল্যবিবাহের কারণে প্রসূতি মৃত্যুর ঝুঁকি প্রায় ৪০% বৃদ্ধি পায়। এছাড়া অপুষ্ট শিশুর জন্ম হওয়ার সম্ভাবনাও থাকে অনেক বেশি। বাল্যবিবাহ কেবল একটি মেয়ের স্বপ্নই কেড়ে নেয় না, বরং তাকে আজীবন শারীরিক জটিলতার দিকে ঠেলে দেয়। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা যেমন ইউনিসেফ প্রতি বছর বাংলাদেশে বাল্যবিবাহ রোধে কোটি কোটি $ ডলার ব্যয় করছে, কিন্তু সামাজিক সচেতনতা ছাড়া এই অর্থ খরচ করেও কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া সম্ভব নয়। তাই অভিভাবকদের নিজ নিজ অবস্থান থেকে এই অভিশাপের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন উপজেলা বিএনপির সিনিয়র সহ-সভাপতি রাকিবুল ইসলাম খান দিব। তিনি বলেন, রাজনীতি কেবল দল করার জন্য নয়, বরং সমাজের উন্নয়ন আর মানুষের মঙ্গলের জন্য হওয়া উচিত। মাদক আর ইভটিজিংয়ের মতো ব্যাধিগুলো সমাজকে কুরে কুরে খাচ্ছে। বিশেষ করে স্মার্টফোনের অপব্যবহারের ফলে ইভটিজিংয়ের ধরণ বদলেছে। ইন্টারনেটে আজেবাজে কন্টেন্ট দেখে কিশোররা বিপথগামী হচ্ছে। তিনি অভিভাবকদের প্রতি আহ্বান জানান, যেন তাঁরা সন্তানদের মোবাইল ব্যবহারের ওপর কঠোর নজরদারি রাখেন। বিশেষ করে গভীর রাত পর্যন্ত সন্তান যেন মোবাইল নিয়ে ব্যস্ত না থাকে, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।
অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে নাগিরাট মকরামপুর দাখিল মাদ্রাসার সুপারিনটেনডেন্ট মোহাম্মাদ আব্দুল আজিজ বলেন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কাজ কেবল বই পড়ানো নয়, বরং একজন শিক্ষার্থীকে আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা। কিন্তু অভিভাবকরা যদি বাড়িতে সচেতন না হন, তবে শিক্ষকের একার পক্ষে কিছু করা সম্ভব নয়। তিনি বলেন, একজন মাদকাসক্ত ব্যক্তি তার নেশার পেছনে প্রতিদিন গড়ে ২০০ থেকে ৫০০ টাকা খরচ করে। মাস শেষে এই অংক দাঁড়ায় প্রায় ১৫০০০ টাকা, যা অনেক পরিবারের মাসিক আয়ের সমান। এই অপচয় রোধ করতে পারলে প্রতিটি পরিবার স্বচ্ছল হতে পারতো।
উপস্থিত অভিভাবকরা অত্যন্ত মনোযোগ সহকারে অতিথিদের কথা শোনেন। অনেক অভিভাবক জানান, তারা আগে জানতেন না যে ১৮ বছরের নিচে বিয়ে দেওয়া আইনি দণ্ডনীয় অপরাধ এবং এর ফলে মেয়ের শরীরের ওপর কতটা ভয়াবহ প্রভাব পড়ে। ইভটিজিং রোধে গ্রামে একটি শক্তিশালী সামাজিক কমিটি গঠনেরও প্রস্তাব দেওয়া হয় অনুষ্ঠানে। অভিভাবকদের দাবি, পাড়ায় পাড়ায় যারা বখাটেপনা করে এবং মাদক সেবন করে, তাদের প্রশাসনের হাতে তুলে দিতে তাঁরা এখন আর ভয় পাবেন না। এই সমাবেশের মাধ্যমে এলাকার মানুষের মধ্যে এক ধরনের সাহস ও সচেতনতা সঞ্চার হয়েছে।
সবশেষে, মাদক ও বাল্যবিবাহমুক্ত শৈলকুপা গড়ার শপথ নিয়ে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘটে। ইউএনও মো. মাহফুজুর রহমান আশ্বাস দেন যে, বাল্যবিবাহ বা মাদকের কোনো খবর পাওয়া মাত্রই প্রশাসন দ্রুত ব্যবস্থা নেবে। তিনি এলাকাবাসীকে জরুরি প্রয়োজনে ‘৩৩৩’ বা ‘৯৯৯’ নম্বরে কল করার পরামর্শ দেন। অনুষ্ঠানের আয়োজকরা মনে করেন, এই ধরনের সচেতনতামূলক সভা যদি ইউনিয়ন পর্যায়ে নিয়মিত আয়োজন করা যায়, তবে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে শৈলকুপা থেকে মাদক এবং বাল্যবিবাহের মতো সমস্যাগুলো অনেকাংশেই কমে আসবে। সমাজের সর্বস্তরের মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টাই পারে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে একটি সুস্থ ও নিরাপদ পৃথিবী উপহার দিতে।
















