সবুজ শৈলকুপার ডাক: বৃক্ষমেলা ও বর্ণাঢ্য র‍্যালিতে জনসচেতনতার নতুন বার্তা

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলায় পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় এক অনন্য উদ্যোগ নিয়েছে উপজেলা প্রশাসন। ‘গাছ লাগিয়ে ভরবো দেশ, আসবে জোয়ার সুদিন বেশ’এই স্লোগানকে সামনে রেখে শৈলকুপায় বর্ণাঢ্য র‍্যালি ও বৃক্ষরোপণ অভিযানের শুভ সূচনা করা হয়েছে। সোমবার সকালে উপজেলা পরিষদ চত্বর থেকে শুরু হওয়া এই র‍্যালিটি শহরের প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে। র‍্যালিতে অংশ নেওয়া শত শত মানুষের হাতে ছিল সবুজায়নের বার্তা সংবলিত ব্যানার ও ফেস্টুন। এই আয়োজনের মূল লক্ষ্য হলো সাধারণ মানুষকে গাছ লাগাতে উৎসাহিত করা এবং প্রকৃতির প্রতি দায়বদ্ধতা বাড়িয়ে তোলা।

র‍্যালিটি যখন শহরের প্রাণকেন্দ্র অতিক্রম করছিল, তখন সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ দেখা যায়। এই কর্মসূচিতে অংশ নেন উপজেলার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, জনপ্রতিনিধি, পুলিশ সদস্য এবং সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। আয়োজকরা জানান, র‍্যালিতে অংশগ্রহণকারীদের প্রায় ৪০% ছিল তরুণ শিক্ষার্থী, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের পরিবেশ সচেতনতার এক ইতিবাচক প্রতিফলন। শিক্ষার্থীরা তাদের প্ল্যাকার্ডে ‘একটি গাছ, একটি প্রাণ’ এবং ‘বন ধ্বংস করবেন না’ এমন সব বার্তা তুলে ধরে। শহরের প্রধান সড়কগুলোতে পথচারীদের মধ্যে গাছ লাগানোর গুরুত্ব নিয়ে লিফলেটও বিতরণ করা হয়।

বক্তারা র‍্যালি পরবর্তী সংক্ষিপ্ত সমাবেশে বর্তমান বিশ্বের পরিবেশগত সংকটের কথা তুলে ধরেন। তাঁরা বলেন, একটি দেশের সুষম পরিবেশের জন্য মোট ভূখণ্ডের অন্তত ২৫% বনভূমি থাকা অপরিহার্য। কিন্তু বর্তমানে আমাদের দেশে এই বনভূমির পরিমাণ প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। যত্রতত্র গাছ কাটার ফলে গত এক দশকে ঝিনাইদহসহ দেশের উত্তরাঞ্চলে গড় তাপমাত্রা প্রায় ২ থেকে ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রতি বছর সঠিক রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে রোপণ করা চারাগাছের অন্তত ৩০% নষ্ট হয়ে যায়। তাই এবারের অভিযানে কেবল গাছ লাগানো নয়, বরং রোপণ করা গাছের ১০০% বেঁচে থাকা নিশ্চিত করতে বিশেষ তদারকির কথা বলা হয়েছে।

পরিবেশবিদরা জানান, একটি পূর্ণবয়স্ক গাছ সারা বছরে যে পরিমাণ অক্সিজেন দেয় এবং কার্বন-ডাই-অক্সাইড শুষে নেয়, তার বাজারমূল্য হিসাব করলে কয়েক হাজার ডলারের বেশি হবে। বৈশ্বিক বাজারে একটি দামী কাঠের গাছের মূল্য ৫০০থেকে১০০০ডলার পর্যন্ত হতে পারে। সুতরাং গাছ লাগানো কেবল পরিবেশগত নয়, একটি লাভজনক অর্থনৈতিক বিনিয়োগও বটে। শৈলকুপার এই বৃক্ষমেলায় এবার আম, জাম, লিচুসহ বিভিন্ন দেশি ফলদ, বনজ এবং ঔষধি গাছের প্রায় ৬০টি প্রজাতি প্রদর্শন করা হচ্ছে। মেলায় আসা নার্সারি মালিকরা জানান, চারা বিক্রির মাধ্যমে তাঁরা একদিকে যেমন অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হচ্ছেন, অন্যদিকে দেশের সবুজায়নেও ভূমিকা রাখছেন।

র‍্যালিতে অংশ নেওয়া এক স্কুল শিক্ষক বলেন, “আমরা আমাদের ছাত্রছাত্রীদের বইয়ের পাতায় পরিবেশ রক্ষার কথা পড়াই। কিন্তু আজ তারা সরাসরি এই র‍্যালিতে অংশ নিয়ে বুঝতে পারছে গাছ আমাদের জন্য কতটা জরুরি। আমরা যদি আজ থেকে সচেতন না হই, তবে আগামী ২০ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে শৈলকুপা অঞ্চলটি মরুভূমিতে পরিণত হতে পারে।” তিনি আরও জানান, তাঁর স্কুল থেকে এবার অন্তত ১০০০টি চারাগাছ শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে গ্রামের বিভিন্ন বাড়িতে বিতরণের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এর মাধ্যমে গ্রামের সাধারণ কৃষকদের মাঝেও পরিবেশ রক্ষার বার্তা পৌঁছে যাবে।

উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানান, এবারের বৃক্ষরোপণ অভিযান কেবল সরকারি অফিসের আঙিনায় সীমাবদ্ধ থাকবে না। ইউনিয়ন পর্যায়ে এবং রাস্তার দুই ধারে লক্ষাধিক চারা রোপণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোকে এই কাজে সম্পৃক্ত করা হচ্ছে। বক্তারা আরও বলেন, বর্তমান সময়ে যখন বিশ্বজুড়ে ‘গ্লোবাল ওয়ার্মিং’ বা বৈশ্বিক উষ্ণায়ন নিয়ে আলোচনা চলছে, তখন আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশে বৃক্ষরোপণই হতে পারে প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলার প্রধান হাতিয়ার। র‍্যালি থেকে বনদস্যুদের প্রতি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলা হয়, অবৈধভাবে গাছ কাটা বন্ধে প্রশাসন জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করবে।

শৈলকুপার এই বর্ণাঢ্য র‍্যালি ও বৃক্ষমেলা স্থানীয় মানুষের মনে আশার আলো জাগিয়েছে। মেলা চত্বরে প্রতিদিন কয়েক হাজার মানুষের সমাগম ঘটছে। অনেকে ১০ টাকা থেকে শুরু করে ৫০০ টাকা মূল্যের চারা কিনছেন নিজের বাড়ির ছাদ বা আঙিনায় লাগানোর জন্য। উদ্যোক্তারা আশা করছেন, এই ধরনের প্রচারণার ফলে এলাকায় সবুজায়ন প্রকল্পের গতি অন্তত ২০% বৃদ্ধি পাবে। পরিশেষে, র‍্যালি থেকে সবাইকে একটি করে ফলদ, একটি বনজ এবং একটি ঔষধি গাছ লাগানোর শপথ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়। শৈলকুপার এই সবুজ আন্দোলন ঝিনাইদহ জেলার অন্যান্য উপজেলার জন্যও একটি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে বলে মনে করছেন সচেতন নাগরিক সমাজ।

সম্পর্কিত নিবন্ধ