সংশোধনের জন্য পুলিশে দিয়েছিলাম, মাদক কারবারি সাজানো হলো কেন? মিশাল মন্ডলের পরিবারের আর্তনাদ

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email


রাজশাহীর পরিচিত ফটোসাংবাদিক মিশাল মন্ডলকে নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও কিছু নামসর্বস্ব নিউজ পোর্টালে ছড়িয়ে পড়া ‘শীর্ষ মাদক কারবারি’ বা ‘অস্ত্রধারী’ তকমার কড়া প্রতিবাদ জানিয়েছে তাঁর পরিবার। সোমবার রাতে নগরীর বোয়ালিয়া মডেল থানাধীন মিরেরচক এলাকায় নিজ বাসভবনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তাঁরা দাবি করেন, মিশাল কোনো সন্ত্রাসী বা মাদক সম্রাট নন। বরং তিনি একজন অসুস্থ মানুষ, যাকে সুস্থ জীবনে ফিরিয়ে আনার জন্য পরিবার নিজেই পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছিল। কিন্তু একটি স্বার্থান্বেষী মহল এই চরম সত্যকে ধামাচাপা দিয়ে ১০০% মিথ্যা ও বানোয়াট তথ্য ছড়িয়ে দিয়ে ফায়দা লুটতে চাইছে।

পরিবারের সদস্যরা সংবাদ সম্মেলনে কান্নায় ভেঙে পড়েন। তাঁরা জানান, গত ৭-৮ মাস ধরে মিশাল মন্ডল মাদকের মরণনেশায় জড়িয়ে পড়েছিলেন। একজন পেশাদার মানুষ যখন বিপথে যায়, তখন সেই পরিবারের ওপর দিয়ে কী ঝড় বয়ে যায়, তা কেবল ভুক্তভোগীরাই বোঝেন। মিশালকে এই ধ্বংসের পথ থেকে রক্ষা করতে এবং সুচিকিৎসার মাধ্যমে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার মহৎ উদ্দেশ্যেই তাঁর ভাই মিশুসহ পরিবারের অন্য সদস্যরা প্রশাসনের সরাসরি সহযোগিতা চেয়েছিলেন। সেই তথ্যের ভিত্তিতেই গত ২৮ আগস্ট রাতে নগরীর খুলিপাড়া এলাকায় মাদক সেবনরত অবস্থায় ২১ পিস ইয়াবাসহ পুলিশ তাঁকে আটক করে। পরিবারের লক্ষ্য ছিল তাঁকে আইনের মাধ্যমে পুনর্বাসনে পাঠানো, কিন্তু কিছু কুচক্রী মহল একে ‘মাদক সম্রাট’ হিসেবে প্রচার করে ফায়দা লুটছে।

মিশাল মন্ডল দীর্ঘ সময় ধরে দৈনিক উপচার, বাংলার জনপদ এবং বরেন্দ্র টেলিভিশনের মতো জনপ্রিয় গণমাধ্যমে একজন দক্ষ ফটোসাংবাদিক হিসেবে কাজ করেছেন। একজন সৎ ও সাহসী কর্মী হিসেবে তিনি সাংবাদিক মহলে পরিচিত ছিলেন। তবে নেশার ঘোরে গত কয়েক মাস তিনি পেশাগত কাজে অনিয়মিত হয়ে পড়েন এবং মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। পরিবারের অভিযোগ, সাংবাদিক সমাজের অভ্যন্তরীণ দীর্ঘদিনের কোনো কোন্দলকে কাজে লাগিয়ে কিছু লোক এখন তাঁর ওপর প্রতিশোধ নিচ্ছে। তারা মিশালের ব্যক্তিগত ফেসবুক প্রোফাইল থেকে সাধারণ ছবি নিয়ে এআই (AI) বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে হাতের মধ্যে পিস্তল বসিয়ে দিয়েছে। বর্তমান প্রযুক্তির যুগে কাউকে সামাজিকভাবে হত্যা করা কতটা সহজ হয়ে গেছে, এটি তারই এক জঘন্য প্রমাণ।

সংবাদ সম্মেলনে মিশালের ছোট বোন যখন লিখিত বক্তব্য পাঠ করছিলেন, তখন পাশে বসেছিলেন তাঁর বৃদ্ধা মা, স্ত্রী ও অবুঝ সন্তান। তাঁরা বলেন, প্রায় ৬-৭ বছর আগে রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় তাঁর বিরুদ্ধে কিছু পুরনো মামলা হয়েছিল, কিন্তু গত কয়েক বছরে তাঁর কোনো নতুন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের রেকর্ড নেই। অথচ কোনো আদালত দোষী সাব্যস্ত করার আগেই কতিপয় অনিবন্ধিত পোর্টাল তাঁকে ‘ভুয়া সাংবাদিক’ ও ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’ বানিয়ে খবর ছেপেছে। এটি কেবল সাংবাদিকতার নূন্যতম নীতিমালার লঙ্ঘন নয়, বরং একটি সাজানো পরিবারের সম্মান ধূলিসাৎ করার অপচেষ্টা। মিশালের শিশু সন্তানের ভবিষ্যৎ এখন এই মিথ্যা অপপ্রচারের কারণে হুমকির মুখে পড়েছে।

পরিবার পরিষ্কারভাবে হুঁশিয়ারি দিয়েছে যে, তারা এই জঘন্য অপপ্রচারের বিরুদ্ধে কোনোভাবেই চুপ থাকবে না। ইতিমধ্যে তারা সাইবার সুরক্ষা আইনে মামলা করার যাবতীয় প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। তাদের দাবি, যারা মিশালকে নিয়ে কোনো প্রমাণ ছাড়াই আষাঢ়ে গল্প ফেঁদেছে, তাদের অবিলম্বে নিঃশর্ত ক্ষমা চাইতে হবে। একজন মাদকাসক্ত ব্যক্তি আর একজন মাদক কারবারির মধ্যে যে আকাশ-পাতাল তফাৎ আছে, তা সাধারণ মানুষকে বুঝতে হবে। তারা প্রশাসনের কাছে এই ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং প্রকৃত সত্য সবার সামনে তুলে ধরার আহ্বান জানিয়েছেন।

সংবাদ সম্মেলনে আরও বলা হয়, ৯৯% ক্ষেত্রে দেখা যায় মাদকাসক্তদের পরিবার সমাজ ও পুলিশের ভয়ে লুকিয়ে রাখে, কিন্তু মিশালের পরিবার তাঁকে ফেলে দেয়নি। তাঁরা চেয়েছিলেন আইনের কঠোরতার মাধ্যমে তাঁকে সুস্থ করতে। কিন্তু সমাজের কিছু মানুষের কুৎসিত আচরণের কারণে এখন তাঁরা সামাজিকভাবে একঘরে হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছেন। এই কঠিন সময়ে তাঁরা গণমাধ্যমকর্মী ও সচেতন দেশবাসীর সহযোগিতা চেয়েছেন যাতে সত্য জয়ী হয় এবং কোনো নিরপরাধ মানুষ বা তাঁর পরিবার এভাবে বিচারহীনতার শিকার না হয়। মিশালের স্ত্রী বলেন, “আমরা কি আমাদের মানুষকে ভালো করতে চেয়ে অপরাধ করেছি? তবে কেন আমাদের পুরো পরিবারকে এভাবে সামাজিকভাবে জবাই করা হচ্ছে?”

সম্পর্কিত নিবন্ধ