মোঃ মিনারুল ইসলাম, চুুয়াডাঙ্গা:
চুয়াডাঙ্গায় জেঁকে বসেছে নিউমোনিয়ার প্রকোপ। বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে এই রোগের হার এতটাই বেড়েছে যে, স্থানীয় হাসপাতালগুলোতে এখন তিল ধারণের জায়গা নেই। গত ৩১ আগস্ট ২০২৬ তারিখের তথ্য অনুযায়ী, চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে গত ১২ দিনে মোট ৫৫৬ জন শিশু ভর্তি হয়েছে। চিকিৎসকরা বলছেন, ভোরের দিকে ঠান্ডা আর দুপুরে প্রচণ্ড গরম এই দুইয়ের যাঁতাকলে পিষ্ট হচ্ছে শিশুরা। হাসপাতালের প্রতিটি কোণ এখন শিশুদের কান্না আর অভিভাবকদের দুশ্চিন্তায় ভারী হয়ে আছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে পুরো হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
হাসপাতালের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বর্তমানে শয্যা সংকটের এক ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে। মাত্র ২২টি শয্যার বিপরীতে রোগীর সংখ্যা ৫০০ ছাড়িয়ে গেছে অনেক আগেই। অর্থাৎ, ধারণক্ষমতার তুলনায় প্রায় ২৫০০% বেশি রোগী সামলাতে হচ্ছে এই ওয়ার্ডটিকে। ২০টি সাধারণ শয্যা আর দুটি কেবিন নিয়ে এই শিশু বিভাগটি সাজানো। কিন্তু বর্তমানে ওয়ার্ডে প্রতিদিন ১০০ জনেরও বেশি শিশু সার্বক্ষণিক চিকিৎসা নিচ্ছে। এর মানে হলো, প্রতিটি বেডের বিপরীতে গড়ে ৫ জন করে শিশু থাকছে। এই বিপুল চাপ সামলাতে না পেরে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এখন অনেক শিশুকে ওয়ার্ডের নোংরা মেঝেতেই বিছানা পেতে চিকিৎসা দিচ্ছে।
সরেজমিনে হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায় এক করুণ দৃশ্য। ওয়ার্ডের ভেতর পা ফেলার মতো ফাঁকা জায়গা নেই। করিডোর থেকে শুরু করে বারান্দা সবখানেই রোগীদের ভিড়। চার মাস বয়সী শিশু জাবেরের নানী ডলি খাতুন জানান, তার নাতির নিউমোনিয়া হয়েছে। কয়েকদিন ধরে বিশেষজ্ঞ ডাক্তার দেখিয়ে ইনজেকশন দিলেও অবস্থার কোনো উন্নতি হয়নি, তাই বাধ্য হয়ে হাসপাতালে নিয়ে এসেছেন। একই অবস্থা এক মাস বয়সী শিশু রায়হানেরও। তার বাবা জানালেন, এক সপ্তাহ ধরে ঠান্ডা-জ্বরে ভোগার পর তারা জীবননগর থেকে এখানে এসেছেন। এমন শত শত পরিবার এখন সুচিকিৎসার আশায় হাসপাতালের মেঝেতে রাত কাটাচ্ছেন, যেখানে ন্যূনতম স্বাচ্ছন্দ্যটুকুও নেই।
ইনডোরের পাশাপাশি বহির্বিভাগ বা আউটডোরেও রোগীদের দীর্ঘ লাইন দেখা যাচ্ছে। প্রতিদিন গড়ে ৩০০ থেকে ৩৫০ শিশু এখানে চিকিৎসা নিতে আসছে। মাত্র দুইজন চিকিৎসককে এই বিশাল সংখ্যক শিশুর পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে হচ্ছে। তার মানে, একজন ডাক্তারকে দিনে অন্তত ১৫০-১৭৫ জন শিশু রোগী দেখতে হচ্ছে। এই চাপে চিকিৎসাসেবার মান বজায় রাখা যেমন কঠিন হয়ে পড়ছে, তেমনি দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে অসুস্থ শিশুরা আরও বেশি দুর্বল হয়ে পড়ছে। অনেক নিম্নবিত্ত পরিবারের জন্য প্রয়োজনীয় ওষুধ বা স্যালাইনের সামান্য কিছু ডলার ($) সমমূল্যের খরচ জোগাড় করাও এখন কষ্টকর হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কেন হঠাৎ করে নিউমোনিয়া আর ঠান্ডার প্রকোপ এত বাড়ল? এ বিষয়ে চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ফারহানা ওয়াহিদ তানি বলেন, বর্তমানের অতিরিক্ত গরমই শিশুদের অসুস্থতার প্রধান কারণ। গরমে শিশুরা বেশি ঘামছে, আর সেই ঘাম শরীরে বসে গিয়েই ফুসফুসে সংক্রমণ বা ঠান্ডা লাগছে। তার ওপর হঠাৎ হঠাৎ বৃষ্টি আর আবহাওয়ার দ্রুত পরিবর্তন পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, তাদের শয্যা সংখ্যা মাত্র ২২টি হলেও মানবিক কারণে তারা কোনো রোগীকে ফিরিয়ে দিচ্ছেন না। ফলে বাধ্য হয়েই মেঝেতে রেখে তাদের চিকিৎসা চালিয়ে যেতে হচ্ছে, যা অত্যন্ত কষ্টসাধ্য।
হাসপাতালের শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. মাহবুবুর রহমান মিলন অভিভাবকদের জন্য বিশেষ কিছু পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি জানান, শিশুদের ঘামা শরীরে হঠাৎ করে ফ্যান বা এসি চালানো যাবে না। ধুলোবালি আর ধোঁয়া থেকে শিশুদের ১০০% দূরে রাখতে হবে। যদি কোনো শিশুর শ্বাসকষ্ট হয়, বুক দেবে যায় কিংবা খেতে না চায়, তবে এক মুহূর্ত দেরি না করে সরকারি হাসপাতালে নিতে হবে। তিনি সতর্ক করে বলেন, ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া নিজে থেকে কোনোভাবেই অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা যাবে না। বিশেষ করে ছয় মাসের কম বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে মায়ের বুকের দুধের কোনো বিকল্প নেই, যা তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে।
এই সংকটময় মুহূর্তে চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের জনবল বৃদ্ধি এবং শয্যা সংখ্যা বাড়ানো এখন সময়ের দাবি। চিকিৎসকরা বলছেন, যদি শিশুদের সঠিক পুষ্টি এবং পর্যাপ্ত তরল খাবার নিশ্চিত করা যায়, তবে সংক্রমণের ঝুঁকি অনেকটাই কমে আসবে। অভিভাবকরা যদি সচেতন না হন, তবে এই নিউমোনিয়ার প্রকোপ আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছেন, জেলা শহরের এই একমাত্র বড় হাসপাতালে যদি দ্রুত সুযোগ-সুবিধা না বাড়ানো হয়, তবে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি আকাশচুম্বী হবে। শিশুদের এই স্বাস্থ্য সংকট কাটাতে সরকারি নজরদারি আরও বাড়ানো প্রয়োজন।
















