বর্তমান সময়ের ব্যস্ত পৃথিবীতে মানুষ যখন সাফল্য আর যশের পেছনে অন্ধ হয়ে ছোটে, তখন ব্যতিক্রমী এক জীবনদর্শনের কথা শুনিয়েছেন প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আবু নাছের। উচ্চশিক্ষিত এবং সম্মানজনক অবস্থানে থেকেও তিনি নিজেকে খুব সাধারণ ও নগণ্য একজন মানুষ হিসেবে পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। তাঁর মতে, পদ-পদবি বা বাহ্যিক চাকচিক্য মানুষের আসল পরিচয় নয়, বরং স্রষ্টার প্রতি আনুগত্য আর মানুষের প্রতি ভালোবাসাই হলো জীবনের মূল ভিত্তি। তিনি বিশ্বাস করেন, পৃথিবীর ১০০% মানুষের মধ্যেই ভুলত্রুটি থাকে, আর সেই ভুলগুলো শুধরে নিয়ে সঠিক পথে চলাই হলো প্রকৃত মানবতা।
ড. আবু নাছের তাঁর দীর্ঘ পথচলায় একটি বিষয় খুব গভীরভাবে উপলব্ধি করেছেন। তিনি মনে করেন, যারা তাঁর সুসময়ে ও দুঃসময়ে পাশে দাঁড়িয়েছেন, তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা নৈতিক দায়িত্ব। তিনি বলেন, “জীবনে অনেক সময় আমরা ১০টি ভালো কাজ করলেও ১টি ভুলের কারণে মানুষের কাছে ছোট হয়ে যাই। কিন্তু যারা আমার মূল্য বোঝেন এবং আমার সীমাবদ্ধতা জেনেও পাশে থাকেন, তাদের জন্য আমার হৃদয়ে সবসময় ১০০ ভাগ ভালোবাসা জমা থাকে।” তিনি বিশ্বাস করেন, মানুষের ভালোবাসা পাওয়া স্রষ্টার এক বিশেষ নেয়ামত, যা অর্থের বিনিময়ে কেনা সম্ভব নয়।
নিজেকে নিয়ে বড় কোনো অহংকার নেই এই শিক্ষাবিদের। বরং নিজের ভুলগুলো নিয়ে তিনি নিয়মিত আত্মজিজ্ঞাসা করেন। তিনি অকপটে স্বীকার করেন যে, মানুষ হিসেবে তিনি কোনোভাবেই ত্রুটিমুক্ত নন। জীবনের চলার পথে কখনো হয়তো নিজের অজান্তেই কাউকে কষ্ট দিয়ে ফেলেছেন অথবা নিজের কাছে নিজেই হেরে গেছেন। সমাজ যখন ৯৫% ক্ষেত্রে মানুষের দোষ খুঁজতে ব্যস্ত, তখন ড. আবু নাছের নিজের ভেতরকার অন্ধকার দূর করার লড়াইয়ে নামেন। তিনি মনে করেন, অন্যের বিচার করার আগে নিজের মনের ময়লা পরিষ্কার করা জরুরি।
আজকাল জাগতিক কোনো বড় প্রাপ্তির আশা তাঁকে টানে না। তাঁর বর্তমান জীবন আবর্তিত হচ্ছে কেবল মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের প্রচেষ্টায়। তিনি এখন ১টি মাত্র জিনিসের কাঙাল, আর তা হলো আল্লাহর ক্ষমা। তাঁর প্রার্থনা একটাই, আল্লাহ যেন তাঁর অন্তরকে পবিত্র করে দেন এবং পথভ্রষ্ট হওয়া থেকে রক্ষা করেন। তিনি প্রতিনিয়ত তওবা পাঠ করেন এবং বিশ্বাস করেন যে, স্রষ্টার দরবারে ক্ষমা চাইলে মন হালকা হয়। তাঁর জীবনের প্রতিটি দিন এখন রবের প্রেমের রঙে রাঙাতে চান তিনি।
প্রফেসর ড. আবু নাছেরের কণ্ঠে প্রতিনিয়ত ঝরে পড়ে বিনীত প্রার্থনা। তিনি বলেন, “হে ইয়া রহমান, ইয়া রাহিম আপনি আমার সব অপরাধ মার্জনা করুন। আমার হৃদয়ে যে অন্ধকারের কালো ছায়া আছে, তা আপনার নূরের আলো দিয়ে দূর করে দিন।” তিনি যখন দুর্বল হয়ে পড়েন, তখন স্রষ্টার কাছে শক্তি চান। তিনি বিশ্বাস করেন, পৃথিবীর মানুষ হয়তো তাঁকে ১% গুরুত্বও দেবে না, কিন্তু তাঁর রবের দরবারে তাঁর জন্য অসীম রহমত অপেক্ষা করছে। এই বিশ্বাসই তাঁকে প্রতিকূল পরিস্থিতিতে টিকে থাকার সাহস জোগায়।
তাঁর এই জীবনদর্শন আমাদের সমাজের জন্য এক বড় শিক্ষা। মানুষ যখন ৫-১০ তলা বাড়ির মালিক হওয়ার প্রতিযোগিতায় মত্ত, তখন একজন প্রফেসর শিখিয়ে দিচ্ছেন কীভাবে মাটির মানুষ হতে হয়। তিনি বলেন, “মানুষের কাছে আমি হয়তো অতি নগণ্য, কিন্তু আমার রবের কাছে আমার আশার কোনো শেষ নেই।” ড. আবু নাছের মনে করেন, যদি আমরা দিনে অন্তত একবার নিজের ভুলগুলো নিয়ে ভাবতাম, তবে সমাজে হানাহানি ৫০% কমে যেত। তাঁর জীবনের এই সহজ-সরল দৃষ্টিভঙ্গি অনেককেই নতুন করে ভাবতে শেখাচ্ছে।
সবশেষে তিনি সবার কাছে দোয়া চেয়েছেন এবং নিজেও প্রার্থনা করেছেন যেন শেষ নিশ্বাস পর্যন্ত ঈমানের পথে অবিচল থাকতে পারেন। তাঁর একমাত্র আকুতি হলো আল্লাহর ভালোবাসায় নিজের অন্তরকে পূর্ণ করা। ড. আবু নাছেরের এই নীরব প্রার্থনা আর আত্মশুদ্ধির গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, দিনশেষে আমরা সবাই রবের কাছে ফিরে যাব। তাই হৃদয়ের অন্ধকার দূর করে স্রষ্টার নূরে নিজেকে আলোকিত করাই হোক আমাদের সবার লক্ষ্য। আমিন।
















