ইরানে মার্কিন হামলার পাল্টা জবাব: জর্ডানে মার্কিন ঘাঁটিতে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র বৃষ্টি ছুড়ল তেহরান

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

মধ্যপ্রাচ্যের রণক্ষেত্রে উত্তেজনা এখন তুঙ্গে। রোববার দিবাগত রাতে ইরান সরাসরি জর্ডানে অবস্থিত মার্কিন সামরিক লক্ষ্যবস্তুগুলোতে বড় ধরনের হামলা চালিয়েছে। ইরানের শক্তিশালী সামরিক বাহিনী ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বা আইআরজিসি এই হামলার দায়িত্ব স্বীকার করেছে। তারা জানিয়েছে, লারাক দ্বীপে যুক্তরাষ্ট্রের অতর্কিত হামলার বদলা নিতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তেহরানের এই ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় জর্ডানের কিং হোসেন ও আল–আজরাক ঘাঁটিতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি করছে তারা।

জর্ডান সরকার এবং তাদের সেনাবাহিনী জানিয়েছে, তারা ইরানের দিক থেকে আসা অন্তত ০৮টি শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্র আকাশেই ধ্বংস করে দিয়েছে। তবে ইরান দাবি করছে, তাদের এই অভিযানে ড্রোন এবং ক্ষেপণাস্ত্রের একটি বড় অংশ সফলভাবে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে। বিশেষ করে শত্রুপক্ষের কারিগরি ও প্রযুক্তিগত অবকাঠামো এবং যেখানে যুদ্ধবিমান রাখা হয়, সেই স্থাপনাগুলো ১০০% ধ্বংস হয়ে গেছে বলে আইআরজিসি তাদের বিবৃতিতে উল্লেখ করেছে। তারা এই অভিযানকে ‘আগ্রাসী শক্তির জন্য উপযুক্ত শাস্তি’ হিসেবে দেখছে।

এই সংঘাতের সূত্রপাত ঘটেছিল গত রোববার সকালে। সেদিন যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালির কাছে অবস্থিত ইরানের লারাক দ্বীপে রকেট হামলা চালায়। মার্কিন কর্মকর্তাদের দাবি অনুযায়ী, ইরান ওই দ্বীপে রকেটের সাহায্যে সাগরে মাইন বিছানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিল। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে মার্কিন বাহিনী সেখানে থাকা ইরানের ০২টি বড় ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ যন্ত্র বা লঞ্চার লক্ষ্য করে হামলা চালায়। গত এক মাসেরও বেশি সময়ের মধ্যে ইরানের ভেতর এটিই ছিল যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম সরাসরি ও বড় কোনো সামরিক হামলা।

লারাক দ্বীপে মার্কিন হামলার ফলে বেশ কয়েকজন ইরানি সেনা ও সাধারণ নাগরিক হতাহত হয়েছেন। এই ঘটনার পরপরই ইরান প্রতিশোধ নেওয়ার হুমকি দিয়েছিল। তেহরান মনে করে, হরমুজ প্রণালির ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ খর্ব করতেই যুক্তরাষ্ট্র এই ষড়যন্ত্রমূলক হামলা চালিয়েছে। উল্লেখ্য, বিশ্বজুড়ে তেল পরিবহনের প্রায় ৩০% এই সরু পথটি দিয়েই হয়। তাই এই অঞ্চলে উত্তেজনা বাড়লে বিশ্ব বাজারে তেলের দাম হুট করে ১০% থেকে ২০% পর্যন্ত বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।

আইআরজিসি তাদের সর্বশেষ বিবৃতিতে বলেছে, শত্রুরা মনে করেছে হামলা চালিয়ে তারা ইরানকে কোণঠাসা করবে, কিন্তু তারা ভুল করছে। তাদের প্রতিটি অপরাধের জবাবে এখন থেকে আরও অনেক গুণ বেশি বিধ্বংসী পাল্টা হামলা চালানো হবে। ইরানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তারা ০% আপস করতেও রাজি নয়। মার্কিন বাহিনীর প্রযুক্তিগত সুবিধা থাকা সত্ত্বেও ইরান যেভাবে জর্ডানের মতো জায়গায় হামলা চালালো, তা আন্তর্জাতিক মহলে নতুন করে উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।

হরমুজ প্রণালির লারাক দ্বীপটি কৌশলগতভাবে ইরানের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই পথ দিয়ে প্রতিদিন কোটি কোটি ডলারের বাণিজ্য হয়। ইরান পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে তাদের কর্তৃত্ব দুর্বল করার যে কোনো চেষ্টা যুক্তরাষ্ট্র বা অন্য কোনো শক্তি করলে তার ফলাফল হবে ভয়াবহ। বর্তমান পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন করা মার্কিন সেনাদের নিরাপত্তা নিয়ে ওয়াশিংটন এখন বেশ চিন্তিত। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এখন পরবর্তী সম্ভাব্য হামলার ধরন নিয়ে কাজ করছে।

আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলা এই ছায়াযুদ্ধ এখন সরাসরি যুদ্ধে রূপ নিচ্ছে। জর্ডানের কিং হোসেন ঘাঁটিতে যেভাবে নিখুঁত নিশানায় হামলা চালানো হয়েছে, তা থেকে স্পষ্ট যে ইরানের কাছে আধুনিক ও শক্তিশালী ড্রোন প্রযুক্তি রয়েছে। বর্তমান বিশ্বের ভূ-রাজনীতিতে মধ্যপ্রাচ্যের এই অস্থিরতা ১০০% প্রভাব ফেলছে। সাধারণ মানুষের মনে এখন বড় প্রশ্ন হলো—এই উত্তেজনা কি শেষ পর্যন্ত একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের দিকে ধাবিত হচ্ছে কি না।

সব মিলিয়ে পরিস্থিতি এখন চরম সংকটাপন্ন। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের এই মুখোমুখি অবস্থান কেবল মধ্যপ্রাচ্য নয়, বরং সারা বিশ্বের অর্থনীতি ও নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। তেহরানের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র যদি তাদের হামলা বন্ধ না করে, তবে আগামীতে তারা আরও বড় কোনো সামরিক ঘাঁটিতে আঘাত হানতে দ্বিধা করবে না। জর্ডানে পরিচালিত এই সফল হামলার পর আইআরজিসির মনোবল এখন অনেকটাই তুঙ্গে রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ