চুয়াডাঙ্গা জেলায় আজ ২৯ আগস্ট ২০২৬, শনিবার সকাল থেকে সব কটি রুটে বাস চলাচল বন্ধ রয়েছে। বাস ও মিনিবাস শ্রমিকদের ওপর ইজিবাইক চালকদের অতর্কিত হামলা ও মারধরের প্রতিবাদে এই অনির্দিষ্টকালের পরিবহন ধর্মঘট ডাকা হয়েছে। হঠাৎ করে বাস চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ যাত্রীরা। চুয়াডাঙ্গা বাস টার্মিনালে গিয়ে দেখা যায়, শত শত মানুষ বাসের জন্য দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করছেন। কোনো বাস না ছাড়ায় জরুরি প্রয়োজনে গন্তব্যে যেতে চাওয়া মানুষগুলো পুরোপুরি দিশেহারা হয়ে পড়েছেন।
ঘটনার সূত্রপাত হয় গত ২৭ আগস্ট, বৃহস্পতিবার। চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার দৌলতদিয়াড় এলাকায় একটি ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক নিয়ম ভেঙে শহরে ঢোকার চেষ্টা করলে পুলিশ ও বাস শ্রমিক ইউনিয়নের সদস্যরা তাকে বাধা দেন। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে ওই ইজিবাইক চালক তার বেশ কিছু সহযোগীকে নিয়ে চুয়াডাঙ্গা-মেহেরপুর আঞ্চলিক মহাসড়কে একটি বাস আটকে দেন। অভিযোগ রয়েছে, তারা বাসের চালক ও সুপারভাইজারকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার পাশাপাশি বাসে ভাঙচুর চালায় এবং তাদের জিম্মি করে রাখে। পরে পুলিশ এসে জিম্মিদের উদ্ধার করলেও শ্রমিকদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে।
এই ঘটনার প্রতিবাদে এবং জড়িতদের দ্রুত গ্রেফতারের দাবিতে গতকাল শুক্রবার থেকেই অভ্যন্তরীণ রুটে বাস চলাচল সীমিত করা হয়। শুক্রবার সন্ধ্যায় চুয়াডাঙ্গা আন্তঃজেলা বাস-মিনিবাস মালিক গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক হাজী আবুল কালাম আজাদ আনুষ্ঠানিকভাবে সব রুটে বাস বন্ধের ঘোষণা দেন। আজ শনিবার থেকে চুয়াডাঙ্গা-মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা-কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা-ঝিনাইদহ, চুয়াডাঙ্গা-জীবননগর ও চুয়াডাঙ্গা-হাটবোয়ালিয়া রুটে কোনো বাস চলাচল করছে না। মালিক ও শ্রমিক সংগঠনের নেতারা সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, প্রশাসনের পক্ষ থেকে দৃশ্যমান পদক্ষেপ না নেওয়া পর্যন্ত তাদের এই ধর্মঘট চলবে।
পরিবহন ধর্মঘটের কারণে সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়েছেন নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষ। বাসের অভাবে যাত্রীরা বিকল্প হিসেবে ইজিবাইক, ভ্যান বা মোটরসাইকেলের ওপর নির্ভর করছেন। আর এই সুযোগে চালকরা ভাড়ার পরিমাণ কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছেন। যেখানে আগে একজনের বাস ভাড়া ছিল ৫০ টাকা, সেখানে এখন ছোট যানবাহনে ১০০ থেকে ১৫০ টাকা পর্যন্ত দাবি করা হচ্ছে। অর্থাৎ যাতায়াত খরচ এক লাফে ২০০% থেকে ৩০০% পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। অনেক যাত্রী অতিরিক্ত ভাড়া দিতে না পেরে তপ্ত রোদে পায়ে হেঁটেই গন্তব্যের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছেন।
ভুক্তভোগী যাত্রী আরাফাত হোসেন আক্ষেপ করে বলেন, “আমার আজ মেহেরপুর যাওয়ার খুব দরকার ছিল। বাস টার্মিনালে এসে শুনি সব বন্ধ। এখন মোটরসাইকেল চালকরা ৫০০ টাকা ভাড়া চাচ্ছে, যা আমার সামর্থ্যের বাইরে।” আরেক যাত্রী যুবায়ের রহমান জানান, তিনি পরিবার নিয়ে কুষ্টিয়া যাওয়ার জন্য স্টেশনে এসে আটকা পড়েছেন। প্রায় ৩ ঘণ্টা অপেক্ষা করেও কোনো উপায় না পেয়ে তিনি বাড়ি ফিরে যাওয়ার কথা ভাবছেন। যাত্রীদের অভিযোগ, পরিবহন শ্রমিকদের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের বলির পাঁঠা হচ্ছেন সাধারণ মানুষ।
চুয়াডাঙ্গার পরিবহন নেতারা বলছেন, রাস্তায় ইজিবাইকের অবৈধ চলাচল নিয়ন্ত্রণ না করলে এবং শ্রমিকদের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা না দিলে তারা রাস্তায় বাস নামাবেন না। তাদের দাবি, বাস শ্রমিকরা সব সময় ইজিবাইক চালকদের হাতে হয়রানির শিকার হন। এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান না হওয়া পর্যন্ত চুয়াডাঙ্গার ৫টি প্রধান রুটে বাস চলাচল শুরু হওয়ার সম্ভাবনা কম। শ্রমিকদের এই অনড় অবস্থানের কারণে স্থানীয় ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডেও স্থবিরতা নেমে এসেছে। পরিবহন সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, দীর্ঘমেয়াদী ধর্মঘট চললে স্থানীয় অর্থনীতিতে প্রায় ১৫% থেকে ২০% ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
শহরের পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে এবং যেকোনো ধরনের বড় সংঘর্ষ এড়াতে জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। চুয়াডাঙ্গা সদর থানার পুলিশ জানিয়েছে, তারা উভয় পক্ষের সাথে আলোচনা করে বিষয়টি মীমাংসা করার চেষ্টা করছেন। তবে এখনো পর্যন্ত সমাধান না আসায় জনমনে আতঙ্ক বিরাজ করছে। প্রশাসন আশ্বাস দিয়েছে যে, যাত্রীদের ভোগান্তি কমাতে তারা সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাচ্ছেন এবং জড়িতদের খুঁজে বের করে আইনের আওতায় আনা হবে।
সাধারণ মানুষের চাওয়া, দ্রুত আলোচনার মাধ্যমে এই সংকটের সমাধান হোক। ইজিবাইক ও বাসের মধ্যকার এই দ্বৈরথ চুয়াডাঙ্গায় নতুন নয়, তবে এবার তা চরম রূপ নিয়েছে। প্রশাসনের কঠোর তদারকি ও নিয়মতান্ত্রিক ট্রাফিক ব্যবস্থাপনাই পারে এই ভোগান্তি থেকে জনগণকে মুক্তি দিতে। ততক্ষণ পর্যন্ত চুয়াডাঙ্গার হাজার হাজার যাত্রীকে অনির্দিষ্টকালের জন্য এই দুর্ভোগ সয়েই যাতায়াত করতে হবে।
















