বীরগঞ্জে গ্রামীণ ঐতিহ্যের ‘পাতা খেলা’, হাজারো মানুষের উপচেপড়া ভিড়

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

দিনাজপুর জেলার বীরগঞ্জ উপজেলার ৬নং নিজপাড়া ইউনিয়নে সম্প্রতি এক অভাবনীয় দৃশ্য দেখা গেছে। দোমুখা বাজার সংলগ্ন এলাকায় গ্রামবাংলার সেই হারানো ঐতিহ্যবাহী ‘পাতা খেলা’ অনুষ্ঠিত হয়েছে। দোমুখা বাজার যুব সমাজের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় এই বিশেষ আয়োজন করা হয়। চারিদিকে মানুষের ঢল, সবার চোখেমুখে ছিল আনন্দের ছটা। গ্রামীণ এই খেলাটি দেখতে উপজেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজার হাজার মানুষ ভিড় করেন, যা পুরো এলাকার উৎসবের আমেজকে এক নিমেষেই বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। আধুনিক বিনোদনের যুগে এমন আয়োজন সত্যি বিরল।

অনুষ্ঠানের সভাপতিত্ব করেন ৬নং নিজপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোঃ আনিসুর রহমান আনিস। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জেলা বিএনপির উপদেষ্টা ও চেম্বার অব কমার্সের পরিচালক রেজওয়ানুল ইসলাম রিজু, যিনি আগামী উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী। বিশেষ অতিথি হিসেবে মঞ্চে ছিলেন শওকত জুলিয়াস জুয়েল, মোঃ মামুনুর রহমান মামুন, মোস্তাফিজুর রহমান চৌধুরী আকাশ এবং রাইস হাসান তারেক। আমন্ত্রিত অতিথিরা প্রত্যেকেই গ্রামবাংলার সংস্কৃতি ও লোকজ ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তারা মনে করেন, সুস্থ বিনোদনই পারে যুবসমাজকে বিপথ থেকে রক্ষা করতে।

আয়োজক কমিটির সদস্যদের মতে, গত কয়েক বছরের তুলনায় এবার দর্শনার্থীদের উপস্থিতি প্রায় ৮০% বৃদ্ধি পেয়েছে। মাঠের চারপাশে বসা অস্থায়ী দোকানগুলোতে কেনাবেচাও ছিল চোখে পড়ার মতো। কেউ বাদাম বিক্রি করছেন, কেউবা বাচ্চাদের খেলনা। স্থানীয় ছোট ব্যবসায়ীরা জানান, মাত্র একদিনের এই আয়োজনে তারা গড়ে ৫০০০ থেকে ৭০০০ টাকা পর্যন্ত আয় করেছেন। পুরো এলাকাটি যেন একটি বিশাল গ্রামীণ মেলায় পরিণত হয়েছিল। দোমুখা বাজারের এই মাঠটিতে তিল ধারণের জায়গা ছিল না। প্রায় ৫০০০০ বর্গফুট এলাকা জুড়ে মানুষের মাথা আর মাথা দেখা যাচ্ছিল। প্রায় ৪০০০ থেকে ৫০০০ মানুষ সরাসরি এই খেলাটি উপভোগ করেন।

পাতা খেলা মূলত একটি তান্ত্রিক বা লোকজ বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত খেলা। একজন গুণিন বা তান্ত্রিক তার মন্ত্রের শক্তিতে ‘পাতা’ অর্থাৎ একজন মানুষকে মাঠের মাঝখান থেকে নিজের সীমানায় টেনে নেওয়ার চেষ্টা করেন। অন্যদিকে অন্য গুণিনরা তাকে বাধা দেন এবং নিজের দিকে টানেন। এই টানটান উত্তেজনার দৃশ্য দেখে উপস্থিত দর্শকরা বারবার হাততালিতে ফেটে পড়েন। বর্তমান প্রযুক্তিনির্ভর যুগে যেখানে ইউটিউব বা অনলাইন গেমিংয়ের ভিড়ে মানুষ ঘরকুনো হয়ে পড়ছে, সেখানে এমন আদি ও রোমাঞ্চকর বিনোদন দেখে নতুন প্রজন্মের অনেকেই বিষ্ময় প্রকাশ করেছেন।

এলাকার প্রবীণ ব্যক্তিরা দীর্ঘশ্বাস ফেলে জানান, এক সময় এই খেলাগুলো প্রতিটি গ্রামে নিয়মিত হতো। কিন্তু এখন এসব ঐতিহ্য প্রায় বিলুপ্তির পথে। তারা চান প্রতি বছর অন্তত একবার হলেও যেন এমন বড় আয়োজন করা হয়। স্থানীয় অভিভাবকরা জানান, বর্তমান সময়ে শিশুরা যখন মোবাইলের স্ক্রিনে বন্দি, তখন এমন খোলা মাঠে খেলাধুলা তাদের মানসিক বিকাশে দারুণ ভূমিকা রাখে। আয়োজক কমিটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এই আয়োজনটি শতভাগ (১০০%) সফল হয়েছে কারণ এতে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি এবং মানুষ সুশৃঙ্খলভাবে খেলা উপভোগ করেছেন।

দোমুখা বাজার যুব সমাজের তরুণ সদস্যরা জানান, তারা দীর্ঘ এক মাসের প্রস্তুতি নিয়ে এই আয়োজন সম্পন্ন করেছেন। তারা বিশ্বাস করেন, মাদক ও অপরাধমূলক কাজ থেকে তরুণ প্রজন্মকে দূরে রাখতে খেলাধুলার কোনো বিকল্প নেই। এই খেলার পেছনে যে পরিমাণ টাকা খরচ হয়েছে, তার ৯০% এসেছে স্থানীয়দের স্বেচ্ছায় দেওয়া চাঁদা থেকে। তারা ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে এবং আরও বেশি পুরষ্কার দিয়ে এই পাতা খেলার আয়োজন করার পরিকল্পনা করছেন। তাদের এই মহতী উদ্যোগকে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং সচেতন মহল সাধুবাদ জানিয়েছেন।

প্রধান অতিথি রেজওয়ানুল ইসলাম রিজু তার বক্তব্যে বলেন, আমাদের শিকড় ও সংস্কৃতিকে যদি আমরা ভুলে যাই, তবে আমাদের অস্তিত্ব সংকটে পড়বে। তিনি আশ্বাস দেন যে, আগামীতে নির্বাচিত হলে তিনি এই ধরণের গ্রামীণ মেলা ও লোকজ খেলাধুলার জন্য বিশেষ ফান্ডের ব্যবস্থা করবেন। এতে করে স্থানীয় পর্যায়ে সাংস্কৃতিক চর্চা আরও বাড়বে। তরুণরা যাতে স্মার্টফোনের নেশা ছেড়ে মাঠের নেশায় ফেরে, সেদিকে নজর দেওয়া আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে খেলায় অংশগ্রহণকারী বিজয়ী গুণিন ও দলের মাঝে আকর্ষণীয় পুরস্কার তুলে দেওয়া হয়।

বীরগঞ্জের এই পাতা খেলাটি কেবল একটি দিনের সাধারণ আয়োজন ছিল না, এটি ছিল এলাকাবাসীর এক বিশাল মিলনমেলা। অনেক মানুষ যারা কর্মসূত্রে ঢাকা বা অন্য শহরে থাকেন, তারাও এই খেলা উপলক্ষে গ্রামে ফিরেছেন। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামলেও মানুষের উদ্দীপনায় কোনো কমতি ছিল না। উৎসবের সেই রেশ যেন এখনো এলাকাবাসীর মনে গেঁথে আছে। এমন সুন্দর ও উৎসবমুখর আয়োজন বীরগঞ্জ উপজেলার অন্যান্য ইউনিয়নের মানুষের কাছেও এক অনন্য দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ