ঝিনাইদহ শহরের ব্যস্ততম বাইপাস সড়কে বুধবার সকালে ঘটে গেল এক হৃদয়বিদারক দুর্ঘটনা। নড়াইল থেকে মোটরসাইকেলে করে শ্বশুরবাড়ি যাওয়ার পথে একটি যাত্রীবাহী বাসের চাপায় প্রাণ হারিয়েছেন জান্নাতুল ফেরদৌস তুলি (২৭) নামের এক গৃহবধূ। এ ঘটনায় তার স্বামী, যিনি একজন সেনা সদস্য, তিনি নিজেও গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালের বিছানায় মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছেন। বুধবার (২৬ আগস্ট) সকাল সাড়ে ১০টার দিকে শহরের ভুটিয়ারগাতী গ্যাস ডিপো এলাকায় এই মর্মান্তিক ঘটনাটি ঘটে।
পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা যায়, নিহত তুলি নড়াইলের লোহাগড়া উপজেলার বাসিন্দা সোহেল কাজীর স্ত্রী। সোহেল কাজী বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর বিএমএ (বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমি) শাখায় প্রশিক্ষক হিসেবে কর্মরত আছেন। ছুটিতে থাকা অবস্থায় তিনি স্ত্রীকে নিয়ে মোটরসাইকেলে করে নড়াইল থেকে ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলার বড়দাহ এলাকায় যাচ্ছিলেন। লক্ষ্য ছিল শ্বশুরবাড়িতে কয়েকটা দিন আনন্দ করে কাটাবেন। কিন্তু বাইপাস সড়কে দ্রুতগামী একটি বাসের সাথে সংঘর্ষে তাদের সেই সব পরিকল্পনা নিমিষেই ধুলোয় মিশে যায়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, বাইপাস সড়কের ভুটিয়ারগাতী এলাকায় কুষ্টিয়া থেকে খুলনাগামী ‘গড়াই পরিবহন’-এর একটি দ্রুতগামী বাস মোটরসাইকেলটিকে সজোরে ধাক্কা দেয়। বাসের গতিবেগ এতই বেশি ছিল যে মোটরসাইকেল থেকে ছিটকে সরাসরি বাসের চাকার নিচে পড়ে যান তুলি। চাকার নিচে পিষ্ট হয়ে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। অন্যদিকে, চালকের আসনে থাকা সোহেল কাজী রাস্তার পাশে ছিটকে পড়ে মাথায় ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে মারাত্মক আঘাত পান।
দুর্ঘটনার শব্দ শুনে আশেপাশের লোকজন ও ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন। তারা রক্তাক্ত অবস্থায় সোহেল কাজীকে উদ্ধার করে ঝিনাইদহ সদর হাসপাতালে নিয়ে যান। হাসপাতালের চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, তার শরীরের অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ হচ্ছে এবং মাথার আঘাত বেশ গভীর। বর্তমানে তার শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক। তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য হয়তো দ্রুত ঢাকায় স্থানান্তরের প্রয়োজন হতে পারে বলে জানিয়েছেন হাসপাতালের একটি সূত্র।
সাম্প্রতিক এক পরিসংখ্যান বলছে, দেশের মহাসড়কগুলোতে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার হার গত বছরের তুলনায় প্রায় ১৫% থেকে ২০% বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে বেপরোয়া গতিতে বাস চালানো এবং যত্রতত্র ওভারটেকিং করার কারণে এমন অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু নিত্যদিনের ঘটনায় পরিণত হয়েছে। ঝিনাইদহের এই বাইপাস সড়কে গত কয়েক মাসে একাধিক দুর্ঘটনা ঘটেছে, যেখানে নিহতের সংখ্যা ১০ ছাড়িয়ে গেছে। স্থানীয়রা দাবি করছেন, এই এলাকাগুলোতে গতিরোধক বা পুলিশের কঠোর নজরদারি না থাকলে লাশের মিছিল থামানো সম্ভব হবে না।
এদিকে খবর পেয়ে সদর থানা পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে দুর্ঘটনাকবলিত ‘গড়াই পরিবহন’ নামের বাসটি আটক করেছে। বাসের চালক ও হেলপার পালিয়ে যেতে সক্ষম হলেও তাদের শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে। নিহত তুলির মরদেহ পুলিশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য ঝিনাইদহ সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠিয়েছে। দুপুরে হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, নিহত ও আহতদের আত্মীয়-স্বজনদের আহাজারিতে বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। একটি সাধারণ ভ্রমণ যে এভাবে চিরতরে বিচ্ছেদে পরিণত হবে, তা কেউ কল্পনাও করতে পারেনি।
ঝিনাইদহ সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আসাদুজ্জামান গণমাধ্যমকে জানান, বাসের চাকায় পিষ্ট হয়ে এক নারী নিহত হয়েছেন এবং তার স্বামী আহত অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন। আমরা ইতোমধ্যে ঘাতক বাসটি জব্দ করেছি। নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ পাওয়ার পর আইনগত প্রক্রিয়া আরও জোরদার করা হবে। তিনি চালকদের প্রতি সতর্কবার্তা দিয়ে বলেন, রাস্তায় প্রতিযোগিতা করার মানসিকতা পরিহার না করলে এমন ট্র্যাজেডি বারবার ঘটতেই থাকবে।
এ ঘটনায় শৈলকুপার বড়দাহ গ্রামে তুলির বাপের বাড়িতে শোকের মায়া নেমে এসেছে। এলাকার মানুষের দাবি, ঘাতক বাস চালককে যেন কঠোর শাস্তির আওতায় আনা হয়। সড়কে নিয়মিত ফিটনেসবিহীন গাড়ি চালানো এবং অদক্ষ চালকদের দৌরাত্ম্য বন্ধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তারা। এক সেনা সদস্যের পরিবারের এই বড় ক্ষতি সহজে পূরণ হওয়ার নয়। এখন সবার প্রার্থনা, আহত সোহেল কাজী যেন সুস্থ হয়ে আবার ফিরে আসেন।
















