নানিবাড়ি বেড়াতে এসে আর বাড়ি ফেরা হলো না ৭ বছরের শিশু ইয়ামিনের

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

মা-বাবার সাথে নানার বাড়ি বেড়াতে আসা মানেই ছিল অন্যরকম এক আনন্দ। কিন্তু ঝিনাইদহের হরিণাকুণ্ডুর ৭ বছর বয়সী শিশু ইয়ামিনের সেই আনন্দ বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। নানিবাড়ির পুকুরে গোসল করতে গিয়ে মুহূর্তেই সব শেষ হয়ে গেল। মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) বিকেলে হরিণাকুণ্ডু পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ডের পোলতাডাঙ্গা গ্রামে ঘটে যাওয়া এই করুণ ঘটনায় পুরো এলাকায় এখন শোকের মাতম চলছে। আদরের একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে এখন পাথর হয়ে গেছেন ইয়ামিনের মা-বাবা।

নিহত ইয়ামিন ঝিনাইদহ সদর উপজেলার শ্রীরামপুর গ্রামের ইকরামুলের ছেলে। মাত্র ৩ দিন আগেই সে অনেক শখ করে তার নানিবাড়িতে বেড়াতে এসেছিল। পোলতাডাঙ্গা গ্রামের বাসিন্দা নানু রবজেল মণ্ডলের বাড়িতে বেড়াতে এসে সে সমবয়সী শিশুদের সাথে খেলাধুলায় মেতে থাকত। কিন্তু কে জানত যে, এই নানিবাড়িই হবে তার জীবনের শেষ গন্তব্য? বাড়ির চারপাশের পুকুর বা ডোবা শিশুদের জন্য যে কতটা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে, এই দুর্ঘটনাটি আবারও সেই ভয়াবহ স্মৃতি মনে করিয়ে দিল।

মঙ্গলবার বিকেল ঠিক ৩:৩০ মিনিটের দিকে ইয়ামিন তার ৫ বছর বয়সী ছোট মামাতো বোন লামিয়ার সাথে বাড়ির পাশের একটি পুকুরে গোসল করতে যায়। ছোট শিশুদের জলাশয়ের ধারে একা যেতে দেওয়ার ঝুঁকি সবসময় প্রায় ১০০% থাকে। গোসলের একপর্যায়ে তারা সাঁতার না জানায় পুকুরের গভীর পানিতে তলিয়ে যেতে শুরু করে। দীর্ঘক্ষণ পার হয়ে গেলেও তাদের কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে পরিবারের লোকজন দুশ্চিন্তায় পড়ে যান। তারা বাড়ির আশেপাশে ও পুকুর পাড়ে হন্যে হয়ে খোঁজাখুঁজি শুরু করেন।

খোঁজাখুঁজির একপর্যায়ে স্থানীয় লোকজন পুকুরের পানি থেকে ইয়ামিনকে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করেন। এসময় তার শরীরে প্রাণের কোনো স্পন্দন ছিল না বললেই চলে। তবুও শেষ চেষ্টার আশায় তাকে দ্রুত হরিণাকুণ্ডু উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু সেখানকার জরুরি বিভাগে কর্তব্যরত চিকিৎসক পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে অত্যন্ত দুঃখের সাথে জানান যে, হাসপাতালে আনার অনেক আগেই ইয়ামিনের মৃত্যু হয়েছে। এই একটি খবর মুহূর্তেই পরিবারের সব হাসি-আনন্দকে বিষাদে পরিণত করে দেয়।

চিকিৎসকদের মতে, পানিতে ডোবার ঘটনায় প্রথম ৫ থেকে ১০ মিনিট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়ের মধ্যে দ্রুত উদ্ধার করে কৃত্রিম শ্বাস-প্রশ্বাস দেওয়া গেলে জীবন রক্ষা পাওয়ার সম্ভাবনা ৮০% পর্যন্ত বাড়তে পারে। বাংলাদেশে শিশুদের মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে এখন এই পানিতে ডেবাকে চিহ্নিত করা হচ্ছে। সরকারি পরিসংখ্যানে দেখা যায়, গ্রামীণ এলাকায় ৫ থেকে ১০ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে অসতর্কতার কারণে এমন মৃত্যুর হার দিন দিন বাড়ছে। ইয়ামিনের মতো হাজারো শিশু প্রতিবছর কেবল অসচেতনতার বলি হচ্ছে।

এই মর্মান্তিক ঘটনার পর হরিণাকুণ্ডু থানা পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে। তবে পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের অভিযোগ না থাকায় এবং এটি একটি নিছক দুর্ঘটনা হওয়ায় পুলিশ ময়নাতদন্ত ছাড়াই মরদেহ দাফনের অনুমতি দেয়। যাবতীয় আইনি প্রক্রিয়া শেষে সন্ধ্যায় শিশুটির মরদেহ তার পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। হরিণাকুণ্ডু থানার একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, তারা বিষয়টির প্রাথমিক তদন্ত করেছেন। পরিবারের কোনো দাবি না থাকায় মরদেহ দাফনের জন্য দিয়ে দেওয়া হয়েছে।

পোলতাডাঙ্গা গ্রাম এখন পুরোপুরি নিস্তব্ধ। যে নানার বাড়ির আঙিনায় কয়েক ঘণ্টা আগেও ইয়ামিনের হাসাহাসি আর দৌড়ঝাঁপ শোনা যেত, সেখানে এখন কেবল কান্নার রোল। পাড়া-প্রতিবেশীরাও এই অকাল মৃত্যুতে স্তব্ধ হয়ে গেছেন। তারা বলছেন, পুকুর পাড়ে বা জলাশয়ের ধারে শিশুদের পাঠানোর সময় বড়দের নজর রাখা খুবই জরুরি। ইয়ামিনের নিথর দেহ যখন তার নিজের গ্রাম শ্রীরামপুরে নিয়ে যাওয়া হয়, তখন সেখানে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। গ্রামের শত শত মানুষ ভিড় করেন শেষবারের মতো তাকে দেখতে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্ষাকালে বা যে সব এলাকায় পুকুর বেশি, সেখানে শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাড়ির চারপাশে বাউন্ডারি নেট ব্যবহার করা উচিত। ইয়ামিনের বিদেহী আত্মার শান্তি কামনার পাশাপাশি এই ঘটনা যেন অন্য সব মা-বাবার জন্য একটি বড় সতর্কতা হয়, সেটাই এখন সবার প্রত্যাশা। প্রতিটি শিশুর জীবন অমূল্য, আর সামান্য অবহেলায় সেই জীবন প্রদীপ নিভে যাওয়া কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। প্রশাসনের পক্ষ থেকেও জলাশয় ব্যবহারে বাড়তি সচেতনতা অবলম্বনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ