বর্তমান সরকারের ১৮০ দিনের কর্মকাণ্ড নিয়ে সরকারি দলের সাফল্যের দাবিকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে দেশের বিরোধী দলগুলো। তারা বলেছে, দেশের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা এবং বর্তমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দিকে তাকালে এই সরকারকে কোনোভাবেই সফল বলার সুযোগ নেই। গ্যাস-বিদ্যুতের তীব্র সংকট, কলকারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং মানুষের মধ্যে ক্রমবর্ধমান বেকারত্বের আশঙ্কাকে সরকারের বড় ব্যর্থতা হিসেবে দেখছে তারা। বিরোধীদের মতে, জনগণের জানমালের নিরাপত্তা ও মৌলিক অধিকার যেখানে নিশ্চিত নয়, সেখানে সাফল্যের বড়াই করা সাজে না।
আজ বুধবার বিকেলে ১১-দলীয় বিরোধী জোটের এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। রাজধানীর মগবাজারে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানের বাসভবনে এই বৈঠক হয়। বৈঠক শেষে জোটের সমন্বয়ক ও জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন। তিনি সাফ জানিয়ে দেন, জনদুর্ভোগ কমানোর বদলে সরকার ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে এবং দেশ এক গভীর সংকটের দিকে যাচ্ছে।
বৈঠকে অংশ নেওয়া নেতারা অভিযোগ করেন, দেশে জ্বালানি তেল ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম হু হু করে বাড়ছে। বিদ্যুতের লোডশেডিং আর গ্যাসের অভাবে দেশের শিল্প খাত ধ্বংসের পথে। হামিদুর রহমান আযাদ দাবি করেন, গ্যাসের অভাবে বর্তমানে কয়েক শত কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। এর ফলে বিদেশি ক্রেতারা তাদের ক্রয়াদেশ বাতিল করে অন্য দেশে চলে যাচ্ছেন। এই পরিস্থিতি দেশের অর্থনীতির জন্য বড় হুমকি। বেকার হয়ে পড়ছেন হাজার হাজার শ্রমিক। তিনি প্রশ্ন তোলেন, দেশের অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের জীবন যদি এমন ঝুঁকির মুখে পড়ে, তবে তাকে কেন ব্যর্থ সরকার বলা হবে না?
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে জোটের পক্ষ থেকে কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য দেওয়া হয়। যদিও এই তথ্যের কোনো নির্দিষ্ট উৎসের কথা তারা উল্লেখ করেননি, তবে হামিদুর রহমান আযাদ দাবি করেন যে গত ৬ মাসে দেশে অন্তত ৫১২ জন মানুষ গুম বা অপহরণের শিকার হয়েছেন। একই সময়ে প্রায় ১ হাজার ৮০০ জন মানুষ হত্যার শিকার হয়েছেন বলে তারা দাবি করেন। জনগণের জীবনের নিরাপত্তা দিতে না পারা এই সরকারের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা বলে তারা মনে করেন।
আগামী ৩০ আগস্ট আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে বিরোধী জোট নতুন কর্মসূচির ডাক দিয়েছে। ওই দিন গুম হওয়া ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যদের নিয়ে জাতীয় সংসদ অভিমুখে একটি বড় পদযাত্রা হবে। কর্মসূচিটি রাজধানীর শাহবাগ থেকে বিকেল ৩টায় শুরু হবে। পদযাত্রা শেষে গুম হওয়া ব্যক্তিদের পরিবারের পক্ষ থেকে স্পিকারের কাছে একটি স্মারকলিপি জমা দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে বৈঠকে। এছাড়া আগামী ৫ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম থেকে লংমার্চ শুরু করার মাধ্যমে সারাদেশে আন্দোলন ছড়িয়ে দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
বৈঠকে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম সরকারের প্রস্তাবিত নতুন আইন নিয়ে সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, মানবাধিকার কমিশন আইন ও গুম প্রতিরোধ আইন ২০২৬-এর যে খসড়া তৈরি করা হয়েছে, তা আগের চেয়েও দুর্বল। এই আইনে কমিশনের নিজস্ব তদন্তের ক্ষমতা কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। ফলে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় স্বচ্ছ তদন্ত হবে না এবং দোষীদের পার পাওয়ার সুযোগ বাড়বে। তিনি আরও বলেন, সংসদীয় স্থায়ী কমিটির অন্তত গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি পদ বিরোধী দলকে দেওয়ার যে প্রতিশ্রুতি ‘জুলাই সনদে’ ছিল, সরকার তা মানছে না।
বিরোধী জোটের নেতারা আরও বলেন, সরকার ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়ন না করে দেশকে সাংবিধানিক সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। তারা মনে করেন, বিচার বিভাগ থেকে শুরু করে প্রশাসনের সব স্তরে দলীয়করণ করা হয়েছে। এর ফলে সাধারণ মানুষ কোথাও সুবিচার পাচ্ছে না। দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার ফিরিয়ে দিতে আন্দোলন আরও জোরদার করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ১১-দলীয় এই জোট। তারা ঘোষণা করেছেন, দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত রাজপথের কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে।
















