নেত্রকোনার পূর্বধলা উপজেলায় এক ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় ৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। ১৩ আগস্ট ২০২৬, বৃহস্পতিবার বিকেলে নেত্রকোনা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের নারান্দিয়া এলাকায় এই দুর্ঘটনা ঘটে। একটি যাত্রীবাহী পিকআপ ভ্যান এবং সারবোঝাই ট্রাকের মধ্যে এই মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। দুর্ঘটনায় নিহতদের মধ্যে তিনজন পুরুষ এবং একজন নারী রয়েছেন। এছাড়া আরও অন্তত ৬ জন গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন। এই ঘটনায় পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে এবং মহাসড়কে কিছু সময়ের জন্য যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।
প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, এদিন বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে ময়মনসিংহ থেকে একটি পিকআপ ভ্যান যাত্রী নিয়ে নেত্রকোনার দিকে যাচ্ছিল। পিকআপের যাত্রীরা মূলত ভক্ত-অনুরাগী ছিলেন, যারা নেত্রকোনার মদনপুর এলাকায় একটি ওরস মাহফিলে যোগ দিতে যাচ্ছিলেন। ঠিক সেই সময় বিপরীত দিক থেকে আসা একটি সারবোঝাই ট্রাকের সাথে পিকআপটির সরাসরি সংঘর্ষ হয়। সংঘর্ষের তীব্রতা এতটাই বেশি ছিল যে, পিকআপ ভ্যানটির সামনের অংশ একেবারে দুমড়ে-মুচড়ে যায়। ঘটনাস্থলেই একজন নারী ও একজন পুরুষ প্রাণ হারান। পরে স্থানীয়রা আহতদের উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠালে সেখানে আরও দুই ব্যক্তির মৃত্যু হয়।
সড়ক দুর্ঘটনার খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায় শ্যামগঞ্জ পুলিশ ফাঁড়ি, শ্যামগঞ্জ হাইওয়ে পুলিশ এবং ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা। তারা স্থানীয়দের সহযোগিতায় উদ্ধার কাজ শুরু করেন। আহতদের অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় তাদের দ্রুত ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং নেত্রকোনা জেলা হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, আহতদের মধ্যে অন্তত ২ জনের অবস্থা অত্যন্ত সংকটাপন্ন এবং তাদের জীবন বাঁচাতে জরুরি অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হতে পারে। মহাসড়কে দুর্ঘটনাকবলিত গাড়িগুলো থাকায় দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়েছিল, যা পুলিশ পরে সরিয়ে নিলে চলাচল স্বাভাবিক হয়।
বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনার পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রতি বছর ওরস বা ধর্মীয় উৎসবের সময় ট্রাক বা পিকআপে যাত্রী পরিবহনের ফলে দুর্ঘটনার হার প্রায় ১২% বৃদ্ধি পায়। এই পিকআপটিতে থাকা যাত্রীরা সস্তায় যাতায়াতের জন্য মালবাহী গাড়ি ব্যবহার করছিলেন, যা শেষ পর্যন্ত তাদের জীবনের জন্য কাল হয়ে দাঁড়াল। হাইওয়ে পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, মহাসড়কে বড় ট্রাকগুলোর গতিসীমা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে এ ধরনের প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা ঘটে। আজ যে ট্রাকটির সাথে সংঘর্ষ হয়েছে, সেটিতে প্রায় $৩,০০০ ডলার মূল্যের সার বোঝাই ছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে।
পূর্বধলা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল্লাহ আল মামুন এবং শ্যামগঞ্জ হাইওয়ে থানার ওসি মোঃ আমিনুল ইসলাম ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। তারা জানান, নিহতদের পরিচয় শনাক্ত করার কাজ চলছে। এখন পর্যন্ত তাদের পরিবারের সাথে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, বৃষ্টির কারণে রাস্তা পিচ্ছিল থাকায় অথবা চালকের অসতর্কতায় এই সংঘর্ষ হয়ে থাকতে পারে। মহাসড়কে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশের টহল টিম কাজ করছে এবং ঘাতক ট্রাকটিকে জব্দ করা হয়েছে। তবে ট্রাকের চালক ও সহকারী পালিয়ে যাওয়ায় তাদের আটক করা সম্ভব হয়নি।
স্থানীয় বাসিন্দারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, নারান্দিয়া এলাকার এই বাঁকটিতে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটে। মহাসড়কের এই অংশে গতিরোধক বা পর্যাপ্ত সতর্কতামূলক সংকেত না থাকায় চালকরা বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালায়। একজন প্রত্যক্ষদর্শী জানান, পিকআপটি যখন আসছিল, তখন সেটি বেশ দ্রুত ছিল এবং ট্রাকটি হুট করে সামনে চলে আসায় চালক নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারেননি। স্থানীয়রা দাবি জানিয়েছেন যেন মহাসড়কের এই বিপজ্জনক মোড়গুলোতে নজরদারি বাড়ানো হয় যাতে ভবিষ্যতে আর কাউকে এভাবে প্রাণ হারাত না হয়।
বর্তমানে নিহত চারজনের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য নেত্রকোনা আধুনিক সদর হাসপাতাল মর্গে রাখা হয়েছে। আহত ৬ জনের চিকিৎসা চলছে ময়মনসিংহে। তাদের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করতে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তদারকি করা হচ্ছে। দুর্ঘটনার পর থেকে এলাকায় সাধারণ মানুষের ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। ওরসে যাওয়ার আনন্দ মুহূর্তের মধ্যেই বিষাদে পরিণত হয়েছে। পুলিশ বলছে, এই ঘটনায় একটি নিয়মিত মামলা দায়ের করার প্রক্রিয়া চলছে এবং তদন্ত শেষে দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বাংলাদেশের সড়কগুলোতে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যাতায়াত বন্ধ করা এখন সময়ের দাবি। সস্তায় ভ্রমণের জন্য মালবাহী পিকআপে চড়া যে কতটা বিপজ্জনক হতে পারে, পূর্বধলার এই দুর্ঘটনা তার বড় প্রমাণ। সরকারের পক্ষ থেকে বারবার ট্রাকে যাত্রী বহন নিষিদ্ধ করা হলেও মানুষ তা মানছে না, যার ফলে দুর্ঘটনা ও মৃত্যুর মিছিল থামছে না। জনসচেতনতা এবং কঠোর আইন প্রয়োগই পারে এমন অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু রোধ করতে।
















