খুলনা নগরের নিরালা প্রান্তিকা আবাসিক এলাকায় গত কয়েক দিন ধরে একটি নাম মানুষের মুখে মুখে ফিরছিল আরফানা হোসেন নির্জনা। মাত্র ১৬ বছর বয়সী এই কিশোরীর বস্তাবন্দী নিথর দেহ উদ্ধারের ঘটনায় স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিল পুরো শহর। নিজের আদরের সন্তানকে পিটিয়ে হত্যা করার পর বস্তায় ভরে রাস্তার পাশে ফেলে দিয়ে পালিয়ে গিয়েছিলেন জন্মদাতা পিতা আলিম হোসেন ওরফে আকাশ (৪০)। চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকাণ্ডের ১০ দিন পর অবশেষে র্যাব ও পুলিশের যৌথ অভিযানে ধরা পড়েছেন সেই ঘাতক বাবা। শনিবার বেলা পৌনে তিনটার দিকে খুলনা জেলার ডুমুরিয়া বাজার এলাকার একটি অতি সাধারণ চায়ের দোকানে চা খাওয়ার সময় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। মেয়ের রক্ত মাখা হাত নিয়ে গত ১০ দিন ধরে তিনি পালিয়ে বেড়াচ্ছিলেন।
খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের (কেএমপি) দেওয়া তথ্যমতে, আরফানা হত্যার পর থেকেই আকাশকে ধরতে পুলিশের একাধিক টিম মাঠে কাজ করছিল। সহকারী পুলিশ কমিশনার (খুলনা জোন) মো. শফিকুল ইসলাম জানান, আসামী আকাশ অত্যন্ত ধূর্ত প্রকৃতির। তিনি গত ১০ দিনে অন্তত ৫ থেকে ৬ বার নিজের অবস্থান পরিবর্তন করেছেন। পুলিশ ও র্যাব তার পিছু ছাড়েনি। শুক্রবার রাতেই তাকে ধরার জন্য একটি বিশেষ দল ডুমুরিয়া এলাকায় অবস্থান নেয়। কিন্তু সেবারও তিনি পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে জায়গা বদল করেন। তবে শনিবার দুপুরে যখন তিনি আগের জায়গায় ফিরে এসে একটি চায়ের দোকানে বসেন, ঠিক তখনই চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। বর্তমানে তাকে খুলনা সদর থানায় নিবিড়ভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে এবং আগামীকাল রোববার তাকে আদালতে পাঠানো হবে।
এই হত্যাকাণ্ডের পেছনের কাহিনী শুনলে যেকোনো মানুষের গা শিউরে উঠবে। পুলিশ জানিয়েছে, আরফানা ছিল নগরীর সরকারি ইকবাল নগর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির মেধাবী শিক্ষার্থী। সে ছিল তার বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান। কিন্তু তার বাবা-মা দুজনেই দীর্ঘদিনের মাদকাসক্ত ছিলেন। সম্প্রতি আরফানা নিজের পছন্দে এক ছেলেকে বিয়ে করেছিল। সে অপ্রাপ্তবয়স্ক হওয়ায় অভিভাবকরা বুঝিয়ে তাকে স্বামীর বাড়ি থেকে ফিরিয়ে আনেন। কিন্তু বাড়িতে আসার পর আরফানা আবার তার স্বামীর কাছে ফিরে যেতে চাইলে শুরু হয় চরম অশান্তি। এই নিয়ে গত ৮ জুলাই সন্ধ্যায় বাবা-মায়ের সাথে আরফানার তীব্র ঝগড়া হয়। ঝগড়ার এক পর্যায়ে মা আরিফা ইয়াসমিন মেয়েকে এলোপাতাড়ি মারধর করেন। এরপর পাষণ্ড বাবা আকাশ একটি ভারী কাঠের ফালি দিয়ে আরফানার মাথায় সজোরে আঘাত করলে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়।
মেয়ের মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর শোকাতুর হওয়ার বদলে প্রমাণ লোপাটের নেশায় মেতে ওঠেন এই দম্পতি। তারা পরিকল্পনা করেন লাশটি দূরে কোথাও ফেলে দিয়ে আসবেন। সেই রাতে কবুতরের খাবার বহনে ব্যবহৃত একটি বড় প্লাস্টিকের বস্তার ভেতরে একমাত্র মেয়ের মরদেহটি কোনোমতে ঢুকিয়ে মুখ বেঁধে ফেলেন আকাশ। এরপর নিজের মোটরসাইকেলে সেই বস্তাটি তুলে নিয়ে অন্ধকার রাতে শহরের নিরালা প্রান্তিকা আবাসিক এলাকার ৩ নম্বর সড়কের পাশে নির্জন জায়গায় ফেলে দিয়ে আসেন। পরদিন সকালে স্থানীয় লোকজন বস্তা থেকে রক্ত বের হতে দেখে পুলিশে খবর দেন। পুলিশ এসে বস্তা খুলে ১৬ বছর বয়সী নির্জনার ক্ষতবিক্ষত দেহ উদ্ধার করে। ঘটনার পর প্রথম দিকে নিহতের পরিচয় পাওয়া যাচ্ছিল না, যা তদন্তে জটিলতা তৈরি করেছিল।
এরপরের ঘটনা আরও নাটকীয়। লাশের পরিচয় শনাক্ত না হওয়ায় সদর থানার এসআই লাভলী আক্তার বাদী হয়ে একটি অজ্ঞাতনামা হত্যা মামলা করেন। এরই মধ্যে আরফানার মা আরিফা ইয়াসমিন মর্গ গিয়ে নিজের মেয়ের লাশ শনাক্ত করেন এবং অঝোরে কাঁদতে থাকেন। পুলিশের সন্দেহ হয় যখন তারা লক্ষ্য করেন যে, মেয়ের মা শনাক্ত করলেও বাবা আকাশ কোথাও নেই। এরপর মা আরিফা ইয়াসমিনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়। প্রথমে তিনি পুলিশকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করলেও পরে জেরার মুখে ভেঙে পড়েন। গত ১১ জুলাই আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় দেওয়া জবানবন্দিতে তিনি স্বীকার করেন যে, তিনি এবং তার স্বামী মিলেই মেয়েকে হত্যা করেছেন। তার এই স্বীকারোক্তির পরেই আকাশকে ধরার জন্য চিরুনি অভিযান শুরু হয়।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই পরিবারটির প্রায় ৮০% থেকে ৯০% অশান্তির মূলে ছিল মাদক। বাবা এবং মা দুজনেই নেশার টাকার জন্য প্রায়ই ঝগড়া করতেন। আরফানা তার সুন্দর ভবিষ্যতের আশায় স্বামীর কাছে চলে যেতে চেয়েছিল, কিন্তু বাবা-মায়ের জেদ আর নেশার ঘোরে করা অপরাধ তার সব স্বপ্ন কেড়ে নিল। পুলিশ এই মামলাটিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখছে। মাদকাসক্তদের হাতে পারিবারিক নির্যাতনের হার বর্তমান সমাজে প্রায় ৩০% বৃদ্ধি পেয়েছে বলে একটি বেসরকারি পরিসংখ্যান বলছে। এই হত্যাকাণ্ড সেই করুণ বাস্তবতারই একটি উদাহরণ। এলাকাবাসী এই ঘটনার পর ঘাতক বাবার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
গ্রেপ্তারের পর আকাশ পুলিশের কাছে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করেছেন যে, তিনি রাগের মাথায় আঘাত করেছিলেন, কিন্তু মেয়ে মারা যাবে তা ভাবেননি। তবে পুলিশ বলছে, কাঠের ফালি দিয়ে মাথায় আঘাত করা এবং পরে লাশ বস্তাবন্দী করে ফেলে আসা স্পষ্টতই একটি পরিকল্পিত অপরাধ। এই মামলায় এখন পর্যন্ত দুই জনকেই গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়েছে। আরফানার সহপাঠীরা জানায়, নির্জনা খুব শান্ত স্বভাবের ছিল এবং সে পড়ালেখায় বেশ মনোযোগী ছিল। স্কুলের ১০০% শিক্ষার্থীর মধ্যে সে ছিল শিক্ষকদের প্রিয়। তার এমন মৃত্যুতে বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে এখনো কান্নার রোল থামেনি।
যশোর ও খুলনার সীমান্তবর্তী এলাকাগুলো দিয়ে আকাশ ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করছিলেন বলেও জানা গেছে। তবে পুলিশের কঠোর নজরদারির কারণে তিনি সফল হতে পারেননি। সদর থানার কর্মকর্তারা জানান, আসামীকে আদালতে পাঠিয়ে রিমান্ডের আবেদন করা হবে যাতে এই ঘটনার সাথে আর অন্য কেউ জড়িত ছিল কি না বা মাদক চক্রের সাথে তাদের কোনো যোগসূত্র আছে কি না তা জানা যায়। এই চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করতে পুলিশ কোনো কসুর রাখবে না বলে আশ্বস্ত করেছে। এখন খুলনার সাধারণ মানুষের দাবি, আরফানা হত্যার বিচার যেন দ্রুততম সময়ের মধ্যে কার্যকর করা হয়।
















