শিবিরের পদ ছাড়লেন ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েম: লক্ষ্য কি ঢাকা দক্ষিণের মেয়র পদ?

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email


ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশের রাজনীতিতে নতুন এক আলোচনার জন্ম দিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) ভিপি মো. আবু সাদিক, যিনি সবার কাছে সাদিক কায়েম নামেই পরিচিত। তিনি বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় আন্তর্জাতিক সম্পাদকের দায়িত্ব থেকে আজ আনুষ্ঠানিকভাবে অব্যাহতি নিয়েছেন। এই পদত্যাগের পেছনে কোনো ব্যক্তিগত কারণ নয়, বরং সামনের সিটি নির্বাচনে মেয়র পদে লড়াই করার জোরালো প্রস্তুতির ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। রাজনৈতিক মহলে গুঞ্জন উঠেছে যে, জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে তাকে ঢাকা দক্ষিণ সিটির মেয়র প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করা এখন ১০০% সময়ের ব্যাপার মাত্র।

আজ সোমবার বিকেলে সাদিক কায়েম তার নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক আইডিতে একটি আবেগঘন পোস্ট দেন। সেখানে তিনি ছাত্রশিবিরের দায়িত্ব থেকে বিদায় নেওয়ার কথাটি পরিষ্কার করেন। তিনি লেখেন, “দেখতে দেখতে দীর্ঘ এক সোনালি অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটল। সংগঠনের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে ইসলামী ছাত্রশিবির থেকে আজ আমার আনুষ্ঠানিক ছুটি হয়েছে।” তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, তার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর ও প্রোডাক্টিভ সময়গুলো এই সংগঠনের সাথেই কেটেছে। তার এই পোস্ট মুহূর্তেই ভাইরাল হয়ে যায় এবং হাজার হাজার মানুষ সেখানে মন্তব্য করে তার ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক জীবনের সাফল্য কামনা করেন।

সাদিক কায়েমের এই পদত্যাগ নিয়ে জামায়াতে ইসলামীর অভ্যন্তরে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত মাসে দলটির কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে একজন তরুণ ও মেধাবী মুখকে তুলে ধরার বিষয়ে আলোচনা হয়। সেই বৈঠকে উপস্থিত প্রায় ৯৫% সদস্যই মেয়র প্রার্থী হিসেবে সাদিক কায়েমের নাম প্রস্তাব করেন। যদিও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম মজলিশে শুরা, তবে মহানগরী দক্ষিণ শাখা ইতিমধ্যেই তাকে মনোনীত করে কেন্দ্রীয় কমিটির কাছে প্রস্তাব পাঠিয়েছে। জামায়াতের নীতিনির্ধারকরা মনে করছেন, সাদিক কায়েমের মতো একজন শিক্ষিত ও জনপ্রিয় তরুণ নেতাকে সামনে আনলে ভোটারদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া পাওয়া যাবে।

এ বিষয়ে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ জানিয়েছেন, ছাত্রশিবিরের সাংগঠনিক নিয়ম অনুযায়ী পড়াশোনা শেষ হলে বা কর্মজীবনে প্রবেশ করলে সদস্যদের বিদায় নিতে হয়। তিনি আরও নিশ্চিত করেন যে, ঢাকা মহানগরী দক্ষিণ শাখা ইতিমধ্যেই সাদিক কায়েমকে মেয়র পদের জন্য মনোনীত করেছে এবং কেন্দ্রীয় কমিটিও বিষয়টি নিয়ে ইতিবাচক অবস্থানে আছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, খুব দ্রুতই ঢাকা দক্ষিণসহ অন্যান্য সিটি করপোরেশনের প্রার্থীদের নাম আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হবে। জামায়াত নেতারা মনে করছেন, এই নির্বাচনে তরুণ ভোটারদের অন্তত ৮০% ভোট তাদের পক্ষে টানা সম্ভব হবে যদি সাদিক কায়েমের মতো প্রার্থীদের মাঠে রাখা যায়।

সাদিক কায়েম নিজে মেয়র পদের প্রস্তুতি সম্পর্কে এখনই সরাসরি মুখ খুলতে নারাজ। তিনি সংবাদমাধ্যমকে শুধু এটুকুই বলেছেন যে, তিনি নিয়মতান্ত্রিকভাবেই সংগঠন থেকে ছুটি নিয়েছেন। তবে তার ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো দাবি করছে, তিনি ইতিমধ্যেই নির্বাচনের প্রাথমিক ছক কষতে শুরু করেছেন। ঢাকা দক্ষিণের বিভিন্ন এলাকার সমস্যা, ড্রেনেজ ব্যবস্থা ও যানজট নিরসনে কী কী আধুনিক পদক্ষেপ নেওয়া যায়, তা নিয়ে তিনি বিশেষজ্ঞদের সাথে পরামর্শ করছেন। তার লক্ষ্য হলো একটি ১০০% ডিজিটাল ও বাসযোগ্য ঢাকা উপহার দেওয়া।

এদিকে, সাদিক কায়েমের সাথে সাথে ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় কমিটির আরও ৮ (আট) জন গুরুত্বপূর্ণ নেতা আজ সংগঠন থেকে বিদায় নিয়েছেন। এই তালিকায় রয়েছেন কেন্দ্রীয় মিডিয়া সম্পাদক মুতাসিম বিল্লাহ, এইচআরডি সম্পাদক শরীফ মাহমুদ, ছাত্র অধিকার সম্পাদক মুহিবুর রহমান এবং আরও কয়েকজন। বিদায়ী মিডিয়া সম্পাদক মুতাসিম বিল্লাহ জানান, এটি একটি নিয়মিত প্রক্রিয়া। ছাত্রজীবন শেষ হওয়ার পর পেশাগত জীবনে প্রবেশের জন্যই তারা এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তবে এতজন নেতার একসাথে বিদায় নেওয়ার বিষয়টি রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের দৃষ্টি কেড়েছে। তাদের মতে, এটি জামায়াতের আগামী নির্বাচনের জন্য জনবল গুছিয়ে নেওয়ার একটি অংশ হতে পারে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা মনে করছেন, ডাকসুর ভিপি হিসেবে সাদিক কায়েম সাধারণ শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ে সব সময় সোচ্চার ছিলেন। তাই জাতীয় রাজনীতিতে তার প্রবেশ অনেক তরুণকেই আশাবাদী করে তুলছে। সাধারণত দেখা যায়, সিটি নির্বাচনে অভিজ্ঞ ও প্রবীণ নেতাদের প্রাধান্য দেওয়া হয়। কিন্তু এবার জামায়াত যদি সাদিক কায়েমের মতো তরুণকে প্রার্থী করে, তবে তা ঢাকার রাজনীতির ১০০ বছর পুরনো প্রথা ভেঙে নতুন এক নজির স্থাপন করবে। সাধারণ মানুষও এখন প্রথাগত রাজনীতির বাইরে নতুন ও মেধাবী নেতৃত্বের খোঁজ করছেন।

অবশ্য ঢাকা দক্ষিণ সিটির এই মেয়র পদটি পাওয়া মোটেও সহজ হবে না। এখানে বড় রাজনৈতিক দলগুলোর হেভিওয়েট প্রার্থীদের সাথে তাকে পাল্লা দিতে হবে। তবে সাদিক কায়েম মনে করেন, জনগণের ভালোবাসা এবং সঠিক কর্মপরিকল্পনা থাকলে যেকোনো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সম্ভব। তিনি নিজের ক্লিন ইমেজ এবং ছাত্রনেতা হিসেবে অর্জিত জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগিয়ে নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে চান। এখন দেখার বিষয়, জামায়াত আনুষ্ঠানিকভাবে কবে তার নাম ঘোষণা করে এবং সাধারণ ভোটাররা এই তরুণ নেতৃত্বের প্রতি কতটা আস্থা রাখেন। সামনের দিনগুলোতে ঢাকার রাজনীতিতে যে এক বড় পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে, তা এখন প্রায় নিশ্চিত।

সম্পর্কিত নিবন্ধ