বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে নতুন করে যুদ্ধের দামামা বেজে উঠেছে। দীর্ঘদিনের বিরোধ এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, দুই দেশই সরাসরি একে অপরের সামরিক ঘাঁটিতে হামলা চালাচ্ছে। গত সোমবার মধ্যপ্রাচ্যের এই জলপথে পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনা ঘটে। এর মধ্যেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বন্দরের ওপর আবারও নৌ অবরোধ বলবৎ করার ঘোষণা দিয়েছেন। এই ঘোষণার ফলে গত মাসে সই হওয়া দুই দেশের মধ্যকার সমঝোতা স্মারক এখন ভেস্তে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত হয় গত সপ্তাহের রোববার, যখন হরমুজ প্রণালিতে ৩ (তিন)টি জ্বালানিবাহী জাহাজে রহস্যজনক হামলার ঘটনা ঘটে। এর ফলে গত ৮ এপ্রিল থেকে চলে আসা অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি কার্যত অকেজো হয়ে পড়ে। সোমবার ট্রাম্প তার নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ লিখেছেন, যুক্তরাষ্ট্র এখন থেকে ইরানের বন্দরের ওপর কঠোর অবরোধ আরোপ করবে। শুধু তাই নয়, হরমুজ দিয়ে নিরাপদে জাহাজ চলাচলের জন্য এখন থেকে অন্য দেশগুলোকে যুক্তরাষ্ট্রকে নির্দিষ্ট পরিমাণ ‘ফি’ দিতে হবে। ট্রাম্পের দাবি, যুক্তরাষ্ট্র এই জলপথ পাহারা দেওয়ার জন্য যে বিশাল অর্থ ব্যয় করে, তা সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর কাছ থেকে আদায় করা উচিত।
মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই কঠোর পদক্ষেপকে তেহরান সমঝোতা স্মারকের চরম লঙ্ঘন হিসেবে দেখছে। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি তাদের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়, তবে ইরানও আর কোনো শর্ত মানবে না। উল্লেখ্য, গত ফেব্রুয়ারি মাসে যুদ্ধ শুরুর পর ১৭ জুন একটি ১৪ দফার সমঝোতা স্মারক সই হয়েছিল। সেই স্মারকের ১০ নম্বর দফায় ইরানের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ট্রাম্প নতুন করে নৌ অবরোধের ঘোষণা দেওয়ায় তেহরান এখন হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিচ্ছে।
সামরিক শক্তির বিচারে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে পিছিয়ে থাকলেও ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে হরমুজ প্রণালিই তাদের সবচেয়ে বড় অস্ত্র। সোমবার রাতে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা, উপকূলীয় রাডার এবং ড্রোন স্থাপনা লক্ষ্য করে তীব্র হামলা চালিয়েছে। মার্কিন বাহিনী প্রথমবারের মতো ‘একমুখী’ সামুদ্রিক ড্রোন ব্যবহার করে এই হামলা পরিচালনা করে। ইরানের আবাদান ও ইসফাহান প্রদেশে ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে অন্তত ৩ (তিন) জন নিহত হয়েছেন বলে খবর পাওয়া গেছে। ইরান দাবি করেছে, হামলার শব্দে তাদের বন্দর আব্বাস ও কেশম দ্বীপের মানুষ আতঙ্কিত হয়ে পড়েন।
যুক্তরাষ্ট্রের এই হামলার জবাবে ইরানও খুব দ্রুত পাল্টা ব্যবস্থা নিয়েছে। তেহরানের দাবি অনুযায়ী, তারা মধ্যপ্রাচ্যে কুয়েত, বাহরাইন, ওমান ও জর্ডানে অবস্থিত মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোতে সফলভাবে আঘাত হেনেছে। ইরানের সংবাদমাধ্যম ‘মেহর নিউজ’ জানিয়েছে, বাহরাইনে ইরানের হামলায় একটি মার্কিন ড্রোন বহর পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে। এছাড়া জর্ডানের প্রিন্স হাসান বিমানঘাঁটির জ্বালানি ট্যাংক এবং ওমানের রাডার ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে দাবি করেছে ইরানি বাহিনী। এই পাল্টাপাল্টি হামলায় পুরো মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনার পারদ এখন ১০০% (শতভাগ) উপরে।
এই সংঘাতের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে বিশ্ব অর্থনীতির ওপর। গতকালই আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম প্রায় ৪% (চার শতাংশ) বেড়ে গেছে। যদি ইরান সত্যি সত্যিই হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়, তবে তেলের দাম আকাশচুম্বী হতে পারে, যা বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য বিশাল চিন্তার কারণ। বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্ব তেলের বাণিজ্যের প্রায় ২০% (বিশ শতাংশ) এই সরু জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। কাতারের জর্জটাউন ইউনিভার্সিটির শিক্ষক পল মুসগ্রেভ মনে করেন, আলোচনা যখন আলোর মুখ দেখছিল, তখন হামলার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
বর্তমানে দুই দেশের মধ্যে আলোচনার পথ প্রায় বন্ধ বললেই চলে। সুইজারল্যান্ড ও কাতারে আগে দুই দফা আলোচনা হলেও এখন পরবর্তী ধাপের কোনো দিনক্ষণ ঠিক হয়নি। ওমানও এই বিরোধ মেটাতে মধ্যস্থতার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু মার্কিন চাপের কারণে সেই আলোচনা বিফলে গেছে বলে দাবি করছে তেহরান। অন্যদিকে ট্রাম্প দাবি করেছেন যে, ইরান একটি চূড়ান্ত চুক্তির জন্য আলোচনার অনুরোধ করেছে, যদিও ইরান এই তথ্য সরাসরি অস্বীকার করেছে। বর্তমানে দুই দেশই একে অপরকে দমানোর চেষ্টায় মত্ত, যা বিশ্বশান্তির জন্য এক বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পরিশেষে, ওয়াশিংটন ও তেহরানের এই সামরিক রেষারেষি সাধারণ মানুষের মনে গভীর আতঙ্কের সৃষ্টি করেছে। যদি শীঘ্রই কোনো কূটনৈতিক সমাধান না আসে, তবে এই সংঘাত আরও বড় আকারের যুদ্ধে রূপ নিতে পারে। গবেষক ট্রিটা পারসির মতে, শক্তি প্রয়োগ করে কোনো পক্ষই বাস্তবতা নিজেদের অনুকূলে নিতে পারবে না। শেষ পর্যন্ত উভয় পক্ষকে হয়তো আবারও আলোচনার টেবিলেই ফিরতে হবে। তবে ততোদিনে বিশ্ব অর্থনীতি এবং মধ্যপ্রাচ্যের জানমালের যে বিপুল ক্ষতি হবে, তা পূরণ করা সম্ভব হবে না। এখন দেখার বিষয়, আগামী কয়েক দিনে ট্রাম্পের নৌ অবরোধ এবং ইরানের পাল্টা হুমকি কোন দিকে মোড় নেয়।













