বিশ্বকাপের চকচকে ট্রফি হাতে লিওনেল মেসি, কিন্তু পকেটে কি কোনো টাকা ঢোকে? জেনে নিন আসল রহস্য

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

মাঠের লড়াই শেষ, রেফারি শেষ বাঁশি বাজালেন। একজন ফুটবলার হয়তো দুর্দান্ত এক গোল করে নিজের দলকে জিতিয়ে মাঠ ছাড়লেন। গ্যালারিভর্তি দর্শক তার নাম ধরে চিৎকার করছে। একটু পরেই ঘোষণা হলো তার নাম তিনিই আজকের ‘প্লেয়ার অব দ্য ম্যাচ’। হাতে তুলে দেওয়া হলো একটি ঝকঝকে ট্রফি। কিংবা ধরুন, পুরো টুর্নামেন্ট জুড়ে অসাধারণ খেলে কেউ গোল্ডেন বুট, গোল্ডেন বল অথবা গোল্ডেন গ্লাভস নিজের করে নিলেন। সাধারণ ফুটবল ভক্তদের মনে তখন একটি প্রশ্নই উঁকি দেয়, এই যে এত বড় পুরস্কার, এর সাথে খেলোয়াড়রা কত টাকার চেক পাচ্ছেন? লাখ নাকি কোটি টাকা?

আসলে এই রহস্যের উত্তর জানলে যে কেউ কিছুটা অবাক হতে পারেন। সত্যিটা হলো, ফিফা বিশ্বকাপের মতো সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ আসরে এই ব্যক্তিগত পুরস্কারগুলোর সঙ্গে ফিফা সরাসরি একটি টাকাও দেয় না। হ্যাঁ, আপনি ঠিকই পড়েছেন! ২০০২ সাল থেকে প্রতি ম্যাচের সেরা খেলোয়াড়কে যে ‘প্লেয়ার অব দ্য ম্যাচ’ ট্রফি দেওয়া হয়, সেটি কেবলই একটি সম্মানসূচক পদক। একইভাবে গোল্ডেন বুট বা গোল্ডেন গ্লাভস বিজয়ীরাও ফিফার কাছ থেকে কোনো নগদ অর্থ পান না। ফুটবলারদের হাতের ওই সুন্দর ট্রফিটির ওজন হয়তো অনেক, কিন্তু সেটির সাথে কোনো ডলারের চেক থাকে না। অর্থাৎ, ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সের জন্য ফিফা আলাদা কোনো বাজেট রাখে না।

তাহলে কি ফুটবলারদের এই পুরস্কার জিতে কোনো লাভ নেই? কেন তারা এই ট্রফি জেতার জন্য জীবনের শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে লড়াই করেন? এর উত্তর লুকিয়ে আছে ফুটবলের বিশাল এক অর্থনৈতিক বাজারে। ব্যক্তিগত এই পুরস্কারগুলোর আর্থিক মূল্য সরাসরি না থাকলেও, পরোক্ষভাবে এগুলো একজন খেলোয়াড়ের পকেটে কোটি কোটি টাকা এনে দেয়। যখন একজন খেলোয়াড় ‘প্লেয়ার অব দ্য ম্যাচ’ বা ‘গোল্ডেন বল’ জেতেন, তখন বিশ্বজুড়ে তার পরিচিতি এবং বাজারমূল্য (Market Value) হু হু করে বেড়ে যায়। বড় বড় ক্লাবগুলো তাকে দলে নেওয়ার জন্য কাড়াকাড়ি শুরু করে। কোনো খেলোয়াড় যদি বিশ্বকাপে একটিও গোল্ডেন ট্রফি পান, তবে পরের দলবদলে তার দাম হয়তো ২০% থেকে ৩০% পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। এটাই হলো ফুটবলের আসল ‘জ্যাকপট’।

এছাড়া রয়েছে স্পনসরশিপ এবং এনডোর্সমেন্ট ডিলের মহিমা। নাইকি, অ্যাডিডাস বা পুমা’র মতো বড় ব্র্যান্ডগুলো সব সময় এমন খেলোয়াড়দের খোঁজে থাকে যারা আলোচনার শীর্ষে। যখন একজন ফুটবলার ট্রফি হাতে ক্যামেরার সামনে দাঁড়ান, তখন তার ব্র্যান্ড ভ্যালু ১০০% বেড়ে যায়। অনেক সময় খেলোয়াড়দের নিজস্ব ক্লাবের সাথে যে চুক্তি থাকে, সেখানেও আলাদা শর্ত থাকে। যেমন—যদি কোনো খেলোয়াড় বিশ্বকাপে গোল্ডেন বুট জেতেন, তবে তার ক্লাব তাকে হয়তো ৫,০০,০০০ বা ১,০০০,০০০ ডলার বোনাস দেবে। অর্থাৎ, ফিফা সরাসরি টাকা না দিলেও ট্রফির সৌজন্যে অন্য সব উৎস থেকে টাকার বৃষ্টি শুরু হয়।

চলতি বিশ্বকাপে ব্যক্তিগত নৈপুণ্যের লড়াইয়ে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে এগিয়ে আছেন লিওনেল মেসি ও জুড বেলিংহাম। তারা দুজনেই এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ ৪ (চার) বার করে ম্যাচসেরার পুরস্কার জিতেছেন। তাদের ঠিক পরেই আছেন কিলিয়ান এমবাপ্পে, আর্লিং হলান্ড এবং ভিনিসিয়ুস জুনিয়র। এই তিন তারকা ফুটবলার ৩ বার করে ‘প্লেয়ার অব দ্য ম্যাচ’ ট্রফি নিজের ব্যাগে ভরেছেন। যদিও এই ট্রফিগুলোর সাথে কোনো ক্যাশ প্রাইজ নেই, তবুও এই অর্জনগুলো তাদের ইতিহাসের পাতায় নাম লেখানোর সুযোগ করে দিচ্ছে। আজ থেকে ২০ বছর পর মানুষ মনে রাখবে না কে কত টাকা পেয়েছিল, কিন্তু সবার মনে থাকবে কার শোকেসে কয়টি ট্রফি আছে।

ব্যক্তিগত পুরস্কারের জন্য ফিফা টাকা খরচ না করলেও, দলগত সাফল্যের জন্য কিন্তু রয়েছে বিশাল অঙ্কের প্রাইজমানি। একটি দল যখন চ্যাম্পিয়ন হয়, তখন তারা কিন্তু খালি হাতে ফেরে না। এবারের বিশ্বকাপে যে দেশ চ্যাম্পিয়ন হবে, তারা ফিফার কাছ থেকে পাবে রেকর্ড ৫,০০,০০০,০০ (৫ কোটি) মার্কিন ডলার। বাংলাদেশী মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় ৬০০ কোটি টাকারও বেশি! এই বিপুল পরিমাণ অর্থ ফিফা সেই দেশের ফুটবল ফেডারেশনকে প্রদান করে। সেখান থেকে ফেডারেশন খেলোয়াড়দের একটি নির্দিষ্ট শতাংশ বোনাস হিসেবে দেয়। রানার্সআপ বা সেমিফাইনালিস্ট দলগুলোও বিশাল অঙ্কের অর্থ পায়।

পরিশেষে বলা যায়, ফুটবলের এই গ্ল্যামারাস জগতের সবকিছু টাকার অংকে পরিমাপ করা ঠিক হবে না। একজন খেলোয়াড়ের কাছে ট্রফি হাতে নেওয়া মানে হলো তার আজীবনের সাধনা পূরণ হওয়া। গ্যালারির হাজার হাজার মানুষের অভিবাদন আর ইতিহাসের পাতায় নিজের নাম লিখে রাখা এর মূল্য কোনো ডলার বা চেক দিয়ে বোঝানো সম্ভব নয়। ট্রফি হাতে তোলার সময় চেক না মিললেও, সেই ট্রফিটিই পরে খেলোয়াড়দের জন্য কোটি টাকার দরজা খুলে দেয়। তাই ব্যক্তিগত পুরস্কারে নগদ অর্থ না থাকাটা ফুটবলারদের জন্য কোনো বড় সমস্যাই নয়, বরং এটি তাদের আরও বেশি মর্যাদার অধিকারী করে তোলে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ