দেশের বিভিন্ন প্রান্তে অতিবৃষ্টির কারণে সৃষ্ট জলাবদ্ধতা ও বন্যায় সাধারণ মানুষের জীবন ও সম্পদ রক্ষা করতে প্রশাসনের কর্মকর্তাদের কঠোর নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। আজ রবিবার দুপুরে সচিবালয় থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে আট বিভাগের কমিশনার, ডিআইজি, জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও পুলিশ সুপারসহ মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে এক জরুরি বৈঠকে তিনি এই নির্দেশনা দেন। প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, দুর্যোগের এই সময়ে মানুষের পাশে দাঁড়ানোই প্রশাসনের এক নম্বর কাজ। কোনো ধরনের গাফিলতি বা ত্রাণ বিতরণে অনিয়ম কোনোভাবেই সহ্য করা হবে না।
বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশের বর্তমান বন্যা ও জলাবদ্ধতা পরিস্থিতি সম্পর্কে বিস্তারিত খোঁজখবর নেন। তিনি বলেন, “দুর্যোগপূর্ণ এই পরিস্থিতিতে মানুষের জীবন বাঁচানোই আমাদের প্রধান লক্ষ্য। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কাছে দ্রুত ত্রাণসামগ্রী, শুকনো খাবার, বিশুদ্ধ পানি এবং প্রয়োজনীয় ওষুধ পৌঁছে দিতে হবে।” তিনি বিশেষভাবে নির্দেশ দেন যেন শিশুখাদ্য এবং গর্ভবতী নারীদের চিকিৎসাসেবার ক্ষেত্রে ১০০ শতাংশ নিশ্চয়তা প্রদান করা হয়। এছাড়া আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে স্যানিটেশন ও বিদ্যুতের সুব্যবস্থা নিশ্চিত করার ওপরও তিনি জোর দেন। প্রধানমন্ত্রী কর্মকর্তাদের সতর্ক করে বলেন, দুর্যোগের সুযোগ নিয়ে কোনো অসাধু চক্র যেন চুরি, ডাকাতি বা ত্রাণ আত্মসাৎ করতে না পারে, সেজন্য পুলিশ প্রশাসনকে দিনরাত সতর্ক থাকতে হবে।
মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের তথ্যমতে, চট্টগ্রাম অঞ্চলে জলাবদ্ধতা কিছুটা কমতে শুরু করলেও সিলেট অঞ্চলে মনু নদের বাঁধ ভেঙে যাওয়ায় পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে। এছাড়া রংপুর বিভাগে নতুন করে বড় ধরনের জলাবদ্ধতার আশঙ্কা রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী এসব তথ্য শুনে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সম্ভাব্য সব ধরনের ঝুঁকি মোকাবিলায় প্রস্তুত থাকতে বলেন। ত্রাণ বিতরণে যেন প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তরা অগ্রাধিকার পায় এবং পুরো প্রক্রিয়াটি যেন স্বচ্ছ হয়, তা নিশ্চিত করতে তিনি বিভাগীয় কমিশনারদের তদারকি বাড়াতে বলেন।
জলাবদ্ধতা ও ত্রাণ কার্যক্রমের আলোচনার পাশাপাশি আজ সকালে প্রধানমন্ত্রী ঢাকার লেকগুলোর পরিবেশ রক্ষায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক করেন। সচিবালয়ের এই বৈঠকে ধানমন্ডি ও গুলশান লেকের সংস্কার এবং সৌন্দর্যবর্ধন নিয়ে আলোচনা হয়। প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দেন যে, আগামী ৬ মাসের মধ্যে গুলশান ও বারিধারা লেকের সঙ্গে যুক্ত সব অবৈধ বর্জ্য নির্গমন লাইন বা পয়োনিষ্কাশন লাইন পুরোপুরি বন্ধ করতে হবে। এই অবৈধ সংযোগের কারণে লেকের পানি দূষিত হচ্ছে এবং মশার উপদ্রব বাড়ছে। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) এই লেকগুলোর উন্নয়ন ও আধুনিকায়নের কাজ করবে। এছাড়া বাসাবাড়ি ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে নিজস্ব স্যুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (STP) স্থাপনের বিষয়টিও প্রধানমন্ত্রী গুরুত্বের সাথে পর্যালোচনা করেন।
ঢাকার বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের দুটি বড় প্রকল্প নিয়েও আজ বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী জানান, উত্তর সিটি করপোরেশনের আমিনবাজারে চীনের সিএমইসি গ্রুপ একটি বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করবে। এই কেন্দ্রে প্রতিদিন প্রায় ৩,০০০ টন বর্জ্য পুড়িয়ে ৪২.৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব হবে। আশা করা হচ্ছে, ২০২৮ সালের আগস্ট মাসের মধ্যে এই কেন্দ্র থেকে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হবে। এই প্রকল্পটি আগামী ২৫ বছর পর্যন্ত নিরবচ্ছিন্নভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারবে, যা দেশের জ্বালানি খাতে বড় অবদান রাখবে।
অন্যদিকে, দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মাতুয়াইলে দক্ষিণ কোরিয়ার বিঅ্যান্ডএফ কোম্পানি একটি আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে। এই প্রকল্পের মাধ্যমে বর্জ্য থেকে বছরে প্রায় ১৫,০০০ টন মিথেন গ্যাস উৎপাদন করা হবে। এই গ্যাস ব্যবহার করে বছরে প্রায় ৮১,০০০ মেগাওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাবে, যা দৈনিক গড়ে ২২১ মেগাওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুতের সমান। শুধু বিদ্যুৎ নয়, এই প্রকল্প থেকে উন্নত মানের সার, পশুখাদ্য এবং পরিবেশবান্ধব ইকো-ব্রিকস বা ইটও তৈরি করা হবে। প্রতিদিন গড়ে ৩,০০০ থেকে ৩,৫০০ টন বর্জ্য এই প্ল্যান্টে ব্যবহৃত হবে, যা ঢাকার পরিবেশ রক্ষায় ১০০ শতাংশ কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই প্রকল্পগুলো দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য স্থানীয় সরকার, বিদ্যুৎ ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের মধ্যে একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয় বৈঠক করার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি মনে করেন, বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের এই প্রযুক্তি জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলা এবং বৈশ্বিক উষ্ণায়ন কমানোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশের জন্য একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করতে তিনি কঠোর মনিটরিং করার কথা বলেন।
আজকের এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকগুলোতে স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম এবং ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের প্রশাসকসহ সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। প্রধানমন্ত্রী কর্মকর্তাদের উদ্দেশে বলেন, শহর হোক কিংবা গ্রাম সব জায়গার মানুষের নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করাই বর্তমান সরকারের মূল লক্ষ্য। বিশেষ করে বন্যার এই সময়ে প্রশাসনকে জনগণের সেবক হিসেবে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি। জনগণের ট্যাক্সের টাকার সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করে একটি আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব বাংলাদেশ গড়তে তিনি সবার সহযোগিতা কামনা করেন।














