ঠাকুরগাঁও জেলার পীরগঞ্জ উপজেলায় ঘটে গেছে এক অত্যন্ত হৃদয়বিদারক ও মর্মান্তিক ঘটনা। শুক্রবার ছুটির দিনে আনন্দে মেতে ওঠার কথা ছিল শিশুদের, কিন্তু সেই আনন্দ মুহূর্তের মধ্যেই রূপ নিল বিষাদে। উপজেলার টাঙ্গন নদীতে গোসল করতে নেমে প্রবল স্রোতের তোড়ে ভেসে গিয়ে নাঈম নামের মাত্র ৫ বছর বয়সী এক নিষ্পাপ শিশুর করুণ মৃত্যু হয়েছে। এই ঘটনায় মাইশা (১১) নামের আরেক শিশুকে স্থানীয়রা জীবিত উদ্ধার করতে পারলেও, নাফিসা নামের ১৬ বছর বয়সী এক এসএসসি পরীক্ষার্থী এখনো নদীর পানিতে নিখোঁজ রয়েছে। শুক্রবার (২৬ জুন) দুপুরে উপজেলার করনাই এলাকার টাঙ্গন নদীর আতাইঘাটে এই ভয়াবহ ঘটনাটি ঘটে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও প্রত্যক্ষদর্শীদের কাছ থেকে ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ জানা যায়। শুক্রবার দুপুরে করনাই সরকার গ্রামের সোহেল রানার ছেলে নাঈম, আব্দুর রশিদের মেয়ে মাইশা এবং ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার জুলফিকার আলীর মেয়ে নাফিসা—এই তিন শিশু মিলে টাঙ্গন নদীর আতাইঘাটে গোসল করতে নামে। নাফিসা সম্প্রতি এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছে এবং সে করনাই এলাকায় তার নানির বাড়িতে বেড়াতে এসেছিল। গোসলের একপর্যায়ে নদীর প্রবল স্রোতে তারা তিনজনই ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে এবং গভীর পানিতে তলিয়ে যেতে থাকে। তারা বাঁচার জন্য চিৎকার করতে থাকে।
বাচ্চাদের চিৎকার ও পানিতে হাবুডুবু খেতে দেখে নদীর পাড়ে থাকা স্থানীয় কয়েকজন মানুষ নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দ্রুত নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়েন। তারা অনেক চেষ্টার পর নাঈম ও মাইশাকে পানি থেকে টেনে তুলতে সক্ষম হন। কিন্তু চোখের পলকেই নাফিসা নদীর প্রবল স্রোতে কোথায় যেন হারিয়ে যায়। উদ্ধার করা শিশু নাঈমের অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক হওয়ায় এবং সে প্রচুর পানি খেয়ে ফেলায় স্থানীয়রা তাকে একটুও সময় নষ্ট না করে দ্রুত পীরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, সেখানে পৌঁছানোর পর জরুরি বিভাগের কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে পরীক্ষা করে মৃত ঘোষণা করেন। অন্যদিকে, উদ্ধার হওয়া অপর শিশু মাইশা বর্তমানে সুস্থ আছে এবং তাকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।
এই ঘটনার পর পুরো করনাই সরকার গ্রাম ও আতাইঘাট এলাকায় এক চরম শোকের ছায়া নেমে এসেছে। মাত্র ৫ বছরের শিশু নাঈমের নিথর দেহ যখন তার বাবা-মায়ের সামনে আনা হয়, তখন তাদের কান্নায় চারপাশের পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে। অন্যদিকে, নিখোঁজ নাফিসার নানির বাড়ির লোকজন নদীর পাড়ে বসে অঝোরে কাঁদছেন এবং তাদের মেয়ের ফিরে আসার অপেক্ষায় প্রহর গুনছেন। শুক্রবার সন্ধ্যা পর্যন্ত স্থানীয় সাহসী মানুষেরা জাল ও দড়ি নিয়ে নদীতে ব্যাপক তল্লাশি চালান, কিন্তু নদীর স্রোত বেশি থাকায় নাফিসার কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।
আমাদের দেশে প্রতি বছর বর্ষা ও বন্যার মৌসুমে পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যুর হার উদ্বেগজনকভাবে বেড়ে যায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৪০ জন শিশু পানিতে ডুবে মারা যায়, যার বেশির ভাগ ঘটনাই ঘটে গ্রামের পুকুর বা নদীতে গোসল করতে গিয়ে। এই মৃত্যুগুলো মূলত বাবা-মায়ের অসচেতনতা এবং শিশুদের সাঁতার না জানার কারণেই ঘটে থাকে। সরকার ও বিভিন্ন এনজিও শিশুদের সাঁতার শেখাতে মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার ($) খরচ করে নানা প্রকল্প হাতে নিলেও, গ্রামের সাধারণ মানুষের মাঝে এখনো ১০০% সচেতনতা তৈরি হয়নি।
পীরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ইকবাল হোসেন প্রামাণিক ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে সংবাদমাধ্যমকে বিস্তারিত জানান। তিনি বলেন, খবর পাওয়ার পরপরই পুলিশের একটি দল ঘটনাস্থলে পৌঁছায় এবং স্থানীয়দের সাথে কথা বলে। তিনি আরও জানান, নিখোঁজ ছাত্রী নাফিসাকে উদ্ধারের জন্য ইতিমধ্যে ফায়ার সার্ভিসের বিশেষ ডুবুরি দলকে খবর দেওয়া হয়েছে। তারা তাদের আধুনিক যন্ত্রপাতি নিয়ে খুব দ্রুতই ঘটনাস্থলে পৌঁছে নদীর গভীর তলদেশে উদ্ধার অভিযান শুরু করবে।
নদীর পাড়ে এখন হাজারো মানুষের ভিড়। সবাই প্রার্থনা করছেন যেন অন্তত নিখোঁজ নাফিসার সন্ধান দ্রুত পাওয়া যায়। এই মর্মান্তিক ঘটনা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, বর্ষাকালে নদী বা পুকুরে শিশুদের একা ছেড়ে দেওয়া কতটা ভয়ংকর হতে পারে। স্থানীয় প্রশাসন ও সচেতন নাগরিকরা অভিভাবকদের অনুরোধ করছেন, তারা যেন বর্ষার এই সময়ে তাদের ছোট শিশুদের নদী বা খালের কাছে একা গোসল করতে না দেন। একটু সতর্কতা হয়তো বাঁচিয়ে দিতে পারে এমন অনেক নিষ্পাপ শিশুর অমূল্য জীবন।
















