খাগড়াছড়ি জেলার দীঘিনালায় রাজনৈতিক অঙ্গনে এক বড় ধরনের ধরপাকড়ের ঘটনা ঘটেছে। নানা ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড, হত্যা ও ভাঙচুরের মতো গুরুতর অভিযোগে বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ এবং এর সহযোগী সংগঠন যুবলীগের তিনজন প্রভাবশালী নেতাকে গ্রেপ্তার করেছে স্থানীয় পুলিশ। মঙ্গলবার রাত আনুমানিক সাড়ে ৯টার দিকে উপজেলার বিভিন্ন স্থানে সাঁড়াশি অভিযান চালিয়ে তাদের আটক করা হয়। দীর্ঘদিন ধরে এই নেতারা পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে আত্মগোপনে ছিলেন। তাদের গ্রেপ্তারের খবরে স্থানীয় সাধারণ মানুষের মনে কিছুটা স্বস্তি ফিরে এসেছে।
গ্রেপ্তার হওয়া এই তিন নেতার পরিচয় ইতিমধ্যে নিশ্চিত করেছে দীঘিনালা থানা পুলিশ। তারা হলেন দীঘিনালা উপজেলা আওয়ামী লীগের যুব ও ক্রীড়া বিষয়ক সম্পাদক দিপায়ন বড়ুয়া, বাবুছড়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক লিটন সেন এবং মেরুং উত্তর ইউনিয়ন যুবলীগের সভাপতি আবুল কালাম। এরা প্রত্যেকেই তাদের নিজ নিজ এলাকায় বেশ দাপটের সাথে রাজনীতি করতেন এবং বিগত সরকারের আমলে এলাকার সাধারণ মানুষের ওপর তাদের ব্যাপক প্রভাব ছিল। স্থানীয়দের অভিযোগ, ক্ষমতার অপব্যবহার করে তারা এলাকায় জমি দখল থেকে শুরু করে নানা ধরনের চাঁদাবাজির সাথেও যুক্ত ছিলেন।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, এই তিন নেতার বিরুদ্ধে বিগত সময়ে ঘটা বেশ কয়েকটি গুরুতর অপরাধের মামলা থানায় আগে থেকেই নথিভুক্ত ছিল। এর মধ্যে রাজনৈতিক সংঘাতের জেরে হত্যা, সাধারণ মানুষের বাড়িঘর ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ভাঙচুর এবং নাশকতার মতো জামিন অযোগ্য অপরাধের সরাসরি অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। গত ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকেই তারা নিজেদের এলাকা ছেড়ে গোপনে অন্য জায়গায় আত্মগোপনে চলে যান। পুলিশ তাদের গ্রেপ্তারের জন্য দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন জায়গায় তল্লাশি চালাচ্ছিল, কিন্তু তারা বারবার নিজেদের অবস্থান পরিবর্তন করায় ধরা পড়ছিল না।
অবশেষে মঙ্গলবার রাতে পুলিশের কাছে একটি অত্যন্ত গোপন ও নির্ভরযোগ্য সংবাদ আসে। পুলিশ জানতে পারে যে, এই তিন নেতা রাতের অন্ধকারে নিজেদের এলাকায় ফিরেছেন এবং গোপনে বৈঠক করার চেষ্টা করছেন। খবর পাওয়ার পরপরই দীঘিনালা থানার পুলিশের একাধিক চৌকস দল উপজেলার বাবুছড়া, মেরুং ও বোয়ালখালী বাজার এলাকায় সাধারণ পোশাকে ওত পেতে থাকে। পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে তারা পালানোর চেষ্টা করলেও সতর্ক পুলিশ সদস্যরা চারপাশ ঘিরে ফেলে তাদের তিনজনকে হাতেনাতে ধরে ফেলেন। এই অভিযানে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা বা হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।
আমাদের দেশের রাজনীতিতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এ ধরনের গ্রেপ্তার বা মামলা একটি সাধারণ চিত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে মানবাধিকার কর্মীরা সব সময় দাবি করেন যে, রাজনৈতিক পরিচয়ের বাইরে গিয়ে প্রতিটি অপরাধের সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া উচিত। হত্যা বা ভাঙচুরের মতো ঘটনায় যারা সরাসরি জড়িত, তাদের ১০০% শাস্তির আওতায় আনা দরকার। এতে সমাজে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু অনেক সময় দেখা যায়, শুধু রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণেও অনেকে মিথ্যা মামলার শিকার হন, যার ফলে তাদের পরিবারকে উকিল ও আদালতের পেছনে হাজার হাজার ডলার ($) বা লাখ লাখ টাকা খরচ করতে হয়। তাই পুলিশকে অবশ্যই নিরপেক্ষভাবে এই মামলাগুলোর তদন্ত করতে হবে।
দীঘিনালা থানার বর্তমান ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ইকবাল বাহার চৌধুরী এই গ্রেপ্তারের বিষয়ে গণমাধ্যমকে বিস্তারিত তথ্য দেন। তিনি বলেন, গোপন তথ্যের ভিত্তিতে আমরা অত্যন্ত সতর্কতার সাথে অভিযান চালিয়ে এই তিনজনকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়েছি। তাদের বিরুদ্ধে দীঘিনালা থানায় হত্যা ও ভাঙচুরসহ বিভিন্ন সুনির্দিষ্ট অভিযোগে আগে থেকেই মামলা রয়েছে। পুলিশ তাদের এসব মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়েছে। ওসি আরও জানান, থানায় প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ শেষে বুধবার সকালে কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের আদালতে পাঠানো হবে। পুলিশ আদালতে তাদের রিমান্ড চেয়ে আবেদন করতে পারে, যাতে তাদের সাথে আর কারা কারা এসব অপরাধে জড়িত ছিল, সেই আসল তথ্য বের করে আনা যায়।
খাগড়াছড়ির মতো একটি পাহাড়ি ও স্পর্শকাতর জেলায় রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও শান্তি বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। এখানকার সাধারণ মানুষ সব সময়ই শান্তিতে বসবাস করতে চায়। রাজনৈতিক সংঘাত বা মারামারির কারণে এলাকার ব্যবসা-বাণিজ্য ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা চরমভাবে ব্যাহত হয়। স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা আশা করছেন, প্রশাসন যদি দলমত নির্বিশেষে সব অপরাধীর বিরুদ্ধে এমন কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করে, তবে সমাজ থেকে অপরাধ অনেকখানি কমে আসবে এবং পাহাড়ে একটি সুস্থ ও সুন্দর রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি হবে।
















