বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের নীরব প্রত্যাবর্তন: মাহফুজ আলমের বিস্ফোরক বিশ্লেষণ

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের রাজনীতি থেকে আওয়ামী লীগকে পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। কাগজে-কলমে দলটি ১০০% নিষিদ্ধ থাকলেও, বাস্তবে তারা আবার দেশের রাজনীতিতে ফিরে এসেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা মাহফুজ আলম আজ মঙ্গলবার নিজের ফেসবুক আইডিতে এমন একটি বিস্ফোরক দাবি করেছেন। তিনি মনে করেন, আওয়ামী লীগ শুধু একটি রাজনৈতিক দল নয়, এটি একটি ধর্মতত্ত্ব বা আদর্শ। আর সেই আদর্শের প্রতি মানুষের ইমান বা বিশ্বাস আবার ফিরে এসেছে। কীভাবে দলটি আবার ফিরে আসার সুযোগ পেল, সেই পেছনের গল্পই তিনি সাধারণ মানুষের সামনে তুলে ধরেছেন।

মাহফুজ আলমের মতে, দেশে যখন আইনের শাসনের বদলে মব জাস্টিস বা উচ্ছৃঙ্খল জনতার শাসন শুরু হলো, ঠিক সেদিন থেকেই আওয়ামী লীগের ফেরার পথ তৈরি হয়েছে। গত ১৭ বছরের নির্যাতিত মানুষজন যখন এই মবের শাসনে আনন্দ পেতে শুরু করল, তখন থেকেই মূল আদর্শের পতন ঘটে। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানান, দেশে উগ্রবাদীরা যখন মাজারগুলোতে হামলা চালাল, মসজিদ থেকে ভিন্নমতের মানুষদের বের করে দিল, তখন মানুষ ভয় পেয়েছে। এমনকি হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের ওপর নিপীড়নের সময় যখন নির্যাতিত মানুষ নীরব ভূমিকা পালন করল, তখন এই সুযোগটি আওয়ামী লীগ পুরোপুরি কাজে লাগিয়েছে। সাধারণ মানুষ যখন এই অবিচার দেখেও চুপ থাকে, তখন পুরোনো স্বৈরাচার খুব সহজেই মাথা তুলে দাঁড়ায়।

অন্তর্বর্তী সরকারের ভেতরে থাকা আমলাতন্ত্র এবং গোপন সিন্ডিকেটকেও তিনি কঠোরভাবে দায়ী করেছেন। তিনি জানান, সরকার যখন রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার বদলে পুরোপুরি আমলানির্ভর হয়ে পড়ল, তখন থেকেই বিপত্তি শুরু হয়। সরকারের ভেতরে থাকা একটি ছোট ‘কিচেন ক্যাবিনেট’ বা গোপন সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী দল পুরো ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে। এই ক্যাবিনেটের প্রায় ৮০% থেকে ৯০% মানুষই ছিল জামায়াত, বিএনপি বা আওয়ামী লীগের লুকিয়ে থাকা দালাল। তারা দেশের সাধারণ মানুষের কথা না ভেবে নিজেদের পরিবার এবং প্রতিষ্ঠানের স্বার্থ রক্ষায় ব্যস্ত হয়ে পড়ে। এই স্বার্থের অঙ্ক কয়েক মিলিয়ন ডলার ($) বা শত শত কোটি টাকার কম নয়। এই দুর্নীতিবাজ গোষ্ঠী নিজেদের স্বার্থে বিপ্লবের চেতনাকে বিক্রি করে দিয়েছে।

দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যকার ক্ষমতার লড়াই পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করেছে। মাহফুজ আলম জানান, অন্তর্বর্তী সরকার যখন বিএনপিকে ঠেকাতে জামায়াতকে কাছে টেনে নিল, তখন থেকেই বড় ধরনের রাজনৈতিক বিভাজন শুরু হয়। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর মানুষের প্রত্যাশা ছিল পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থার একটি বিশাল পরিবর্তন হবে। কিন্তু সরকার সেই পুরোনো ব্যবস্থা ভেঙে ফেলার বদলে ‘ন্যূনতম সংস্কার’ এবং ‘ঐকমত্য কমিশন’-এর নামে সাধারণ মানুষকে শুধু বিচ্ছিন্ন এবং হতাশ করেছে। নির্বাচনি ভাগবাঁটোয়ারার মাধ্যমে দেশের বিচারব্যবস্থা এবং সংস্কার প্রক্রিয়াকে বিএনপি-জামায়াতের দরকষাকষির হাতিয়ার বা টুল বানানো হয়েছে।

ছাত্ররাজনীতি এবং ক্যাম্পাসের পরিবেশ নিয়েও তিনি গভীর হতাশা প্রকাশ করেছেন। জুলাইয়ের আন্দোলনে ছাত্ররা যে বিপ্লবী রূপ দেখিয়েছিল, তা বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। মাহফুজ আলম বলেন, ছাত্ররা একটি সত্যিকারের বিপ্লবী সংগঠনে রূপ নেওয়ার বদলে ধীরে ধীরে বিশৃঙ্খল মব বা লুম্পেন চরিত্রের ক্লাবে পরিণত হয়। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলোতে সুস্থ ও সুন্দর গণতন্ত্রের বদলে পেশিশক্তির ‘সংঘতন্ত্র’ জয়ী হয়েছে। যারা জুলাইয়ের আন্দোলনে বুদ্ধি ও সাহস দিয়ে ১০০% সমর্থন জুগিয়েছিল, তাদের পুরোপুরি বাদ দিয়ে শূন্য অবদান রাখা সুবিধাবাদীদের ক্ষমতায় বসানো হয়েছে। এই অবিচার তরুণ সমাজকে প্রচণ্ড হতাশ করেছে।

সংস্কৃতি ও গণমাধ্যমের ওপর আঘাতকেও তিনি আওয়ামী লীগের ফিরে আসার অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন। তিনি জানান, দেশে যখন মিডিয়া ও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের ওপর হামলা শুরু হলো, তখন থেকেই মানুষ আশাহত হতে থাকে। নতুন কোনো গণমাধ্যম অনুমোদন দেওয়ার ক্ষেত্রে সরকারের ভেতরের ওই কিচেন ক্যাবিনেট একজোট হয়ে বাধা দেয়। এছাড়া জুলাই বিপ্লবের ঘোষণাপত্র বা সনদের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় যখন সাধারণ মানুষের হাত থেকে কেড়ে নিয়ে আমলা এবং স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর হাতে তুলে দেওয়া হলো, তখন বিপ্লবের মূল চেতনা চিরতরে হারিয়ে যায়।

সামাজিক মূল্যবোধ ও ইতিহাসের অপব্যাখ্যা নিয়ে তিনি কড়া সমালোচনা করেছেন। ২০২৪ সালের অভ্যুত্থানকে যখন ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষে দাঁড় করানোর চেষ্টা করা হলো, তখন থেকেই আওয়ামী লীগ আবার নতুন করে শক্তি ফিরে পায়। এ দেশে ধর্মনিরপেক্ষ মূল্যবোধে বিশ্বাসী সাধারণ মানুষ যখন সরকার-সমর্থিত ডানপন্থী উগ্রবাদের উত্থান দেখে ভয় পেতে শুরু করল, তখন তারা নিজেদের গুটিয়ে নেয়। বামপন্থী বা শাহবাগীদের পেটালে যখন সাধারণ মানুষ আনন্দ পায়, তখন বুঝতে হবে সমাজের মানসিকতা কতটা নিচে নেমে গেছে। কাওয়ালি বা ইনকিলাবি সংস্কৃতির মতো বিষয়গুলো দিয়ে যখন দেশের নিজস্ব বাঙালি জাতীয়তাবাদকে মোকাবিলার চেষ্টা করা হলো, তখন দেশের শেকড় নড়ে যায়। মাহফুজ আলম তার দীর্ঘ পোস্টের শেষে সতর্ক করে বলেন, আওয়ামী লীগের ফিরে আসার এই কারণগুলোর তালিকা ভবিষ্যতে আরও বড় হবে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ