হকার উচ্ছেদ ও মানবিকতা

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

শহরের ব্যস্ত রাস্তা বা ফুটপাত দিয়ে হাঁটার সময় আমাদের প্রায়ই নানা রকম হকারদের চোখে পড়ে। কেউ হয়তো ভ্যানে করে তরতাজা শাকসবজি বিক্রি করছেন, কেউ ফুটপাতে পলিথিন বিছিয়ে জামাকাপড় বা জুতো সাজিয়ে বসেছেন, আবার কেউবা গরম চা-সিঙাড়া বিক্রি করে পথচারীদের ক্লান্তি মেটাচ্ছেন। আমাদের দৈনন্দিন নাগরিক জীবনের সাথে হকাররা ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছেন। কিন্তু মাঝে মাঝেই আমরা দেখি, শহরের যানজট কমানো ও ফুটপাত দখলমুক্ত করার নামে বুলডোজার দিয়ে হকার উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়। নাগরিক স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য ফুটপাত ফাঁকা রাখা যেমন জরুরি, তেমনি পেটের দায়ে রাস্তায় বসা এই মানুষগুলোর প্রতি মানবিক হওয়াও সমানভাবে প্রয়োজন। হকার উচ্ছেদ ও মানবিকতা এই দুটি বিষয়ের মধ্যে একটি সঠিক ভারসাম্য বজায় রাখা আজ আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ফুটপাত দখল ও নাগরিক দুর্ভোগ

উচ্ছেদের পক্ষে সবচেয়ে বড় যুক্তি হলো নাগরিক দুর্ভোগ ও যানজট। ঢাকা বা অন্যান্য বড় শহরগুলোর ফুটপাতগুলো মূলত পথচারীদের হাঁটার জন্য তৈরি। কিন্তু যখন সেই ফুটপাতের পুরোটাই হকারদের দখলে চলে যায়, তখন সাধারণ মানুষ বাধ্য হয়ে মূল রাস্তা দিয়ে হাঁটেন। এর ফলে রাস্তায় একদিকে যেমন যানজট তৈরি হয়, অন্যদিকে দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বহুগুণ বেড়ে যায়। স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থী, বৃদ্ধ এবং অসুস্থ মানুষদের জন্য এই পরিস্থিতি চরম ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। একটি আধুনিক ও সুন্দর শহরের জন্য রাস্তা এবং ফুটপাত পরিষ্কার থাকাটা অত্যন্ত জরুরি। তাই সিটি কর্পোরেশন বা স্থানীয় প্রশাসন যখন জনস্বার্থে ফুটপাত দখলমুক্ত করার উদ্যোগ নেয়, তখন সাধারণ নাগরিক হিসেবে অনেকেই বিষয়টিকে যৌক্তিক মনে করেন।

হকারদের জীবন সংগ্রাম ও বেঁচে থাকার তাগিদ

ফুটপাতে বসা হকারদের জীবনের দিকে একটু গভীরভাবে তাকালে আমরা অন্য এক নির্মম বাস্তবতা দেখতে পাই। এই মানুষগুলো শখ করে বা বিলাসবহুল জীবনযাপনের জন্য রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে রাস্তায় বসেন না। এরা মূলত নদীভাঙন, চরম দারিদ্র্য বা গ্রামের কর্মসংস্থানের অভাবে শহরে পাড়ি জমানো অসহায় মানুষ। স্ত্রী, সন্তান ও বৃদ্ধ বাবা-মায়ের মুখে দু’মুঠো ভাত তুলে দেওয়ার জন্যই তাদের এই হাড়ভাঙা খাটুনি। সামান্য কিছু পুঁজি নিয়ে তারা রাস্তায় বসেন। তাদের কাছে ব্যবসা করার মতো কোনো নির্দিষ্ট দোকান বা শোরুম ভাড়া নেওয়ার আর্থিক সামর্থ্য নেই। ফুটপাতের এই ছোট ব্যবসাই তাদের বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন এবং স্বপ্নের জায়গা।

উচ্ছেদ অভিযানের নির্মম বাস্তবতা ও হাহাকার

যখন হঠাৎ করে কোনো আগাম নোটিশ ছাড়াই উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়, তখন দৃশ্যটি অত্যন্ত হৃদয়বিদারক হয়ে ওঠে। মুহূর্তের মধ্যে বুলডোজারের নিচে পিষ্ট হয়ে যায় একজন গরিব মানুষের শেষ সম্বলটুকু। অনেক সময় দেখা যায়, পুলিশ বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা তাদের মালামাল বাজেয়াপ্ত করে ট্রাকে তুলে নিয়ে যান। যে মানুষটি হয়তো এনজিও বা মহাজনের কাছ থেকে চড়া সুদে ঋণ নিয়ে মাল কিনেছিলেন, চোখের সামনে সেই মাল নষ্ট হতে দেখে তিনি ডুকরে কেঁদে ওঠেন। এই মানুষগুলোর হাহাকার আর চোখের জল আমাদের মানবিকতাকে গভীরভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করে। উচ্ছেদের পর এই পরিবারগুলো কীভাবে খাবে, কীভাবে বাঁচবে সেই চিন্তা কেউ করে না।

নেপথ্যের চাঁদাবাজি ও শোষণের চক্র

হকাররা যে ফুটপাতে বিনা পয়সায় বসেন, বিষয়টা মোটেও এমন নয়। তারা প্রতিদিন একটি অসাধু চক্রকে চাঁদা দিয়ে তবেই রাস্তায় বসার সুযোগ পান। স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী নেতা, মাস্তান এবং প্রশাসনের কিছু অসাধু কর্মকর্তার পকেটে প্রতিদিন হকারদের কাছ থেকে তোলা লাখ লাখ টাকা চলে যায়। হকাররা নিজেদের আয়ের একটি বড় অংশ এই লাইনম্যানদের হাতে তুলে দিতে বাধ্য হন। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, যখন উচ্ছেদ অভিযান চলে, তখন এই চাঁদা আদায়কারী চক্রটি একদম উধাও হয়ে যায়। তাদের কোনো ক্ষতি হয় না, তারা ধরাও পড়ে না। মাঝখান থেকে সব দায় ও শাস্তি মাথা পেতে নিতে হয় দিনমজুর অসহায় হকারকে। এই শোষণের চক্রটি না ভেঙে শুধু হকার উচ্ছেদ করা কোনোভাবেই ন্যায়বিচার হতে পারে না।

পুনর্বাসন ছাড়া উচ্ছেদ কতটা যৌক্তিক?

শুধু লাঠিপেটা করে বা মালপত্র কেড়ে নিয়ে হকার উচ্ছেদ করা কখনোই দীর্ঘমেয়াদি কোনো সমাধান নয়। আমরা বারবার দেখেছি, আজ উচ্ছেদ হলে দুদিন পর হকাররা আবারও সেই একই জায়গায় এসে বসেন। কারণ, পেটের ক্ষুধা কোনো আইন বা পুলিশের লাঠির ভয় মানে না। বিকল্প কোনো কর্মসংস্থান বা পুনর্বাসনের ব্যবস্থা না করে একজন মানুষকে তার উপার্জনের একমাত্র পথ থেকে সরিয়ে দেওয়া চরম অমানবিক কাজ। পুনর্বাসন ছাড়া উচ্ছেদ অনেকটা ইঁদুর-বিড়াল খেলার মতো, যা বছরের পর বছর ধরে চলছে কিন্তু কোনো সমাধান আসছে না। এতে শুধু সরকারের অর্থ ও সময় নষ্ট হচ্ছে, আর মাঝখান থেকে গরিব মানুষগুলো আরও বেশি নিঃস্ব হচ্ছেন।

আধুনিক নগর পরিকল্পনা ও বিকল্প সমাধান

হকার সমস্যার সমাধানে আমাদের উন্নত দেশগুলোর দিকে তাকাতে হবে। একটি আধুনিক নগর পরিকল্পনায় হকারদের জন্য সুনির্দিষ্ট জায়গা বা ‘হকার্স জোন’ থাকা বাধ্যতামূলক। আমাদের দেশেও এর চমৎকার কিছু বিকল্প সমাধান বের করা সম্ভব। যেমন, ছুটির দিনগুলোতে নির্দিষ্ট রাস্তায় ‘হলিডে মার্কেট’ চালু করা যেতে পারে। এছাড়া সন্ধ্যার পর যখন রাস্তায় ভিড় কম থাকে, তখন কিছু নির্দিষ্ট জায়গায় হকারদের বসার অনুমতি দেওয়া যেতে পারে। তাদেরকে নিবন্ধনের আওতায় এনে বৈধভাবে ব্যবসা করার সুযোগ দিলে তারা আর চাঁদাবাজদের খপ্পরে পড়বেন না, আবার সরকারও রাজস্ব পাবে। ফুটপাতও ফাঁকা থাকবে, আবার গরিব মানুষগুলোর পেটেও লাথি পড়বে না।

উপসংহার

পরিশেষে বলা যায়, একটি শহর সবার। এখানে যেমন বড় বড় অট্টালিকায় থাকা ধনী মানুষের অধিকার রয়েছে, তেমনি ফুটপাতে ঘাম ঝরানো গরিব হকারেরও বেঁচে থাকার সমান অধিকার রয়েছে। আমরা অবশ্যই একটি সুন্দর, যানজটমুক্ত ও পরিষ্কার শহর চাই, তবে তা কোনো গরিব মানুষের চোখের জলের বিনিময়ে নয়। হকার উচ্ছেদ কোনো স্থায়ী সমাধান হতে পারে না, বরং সঠিক পুনর্বাসন এবং মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিই পারে এই সমস্যার একটি টেকসই সমাধান দিতে। রাষ্ট্র ও নগর কর্তৃপক্ষের উচিত কঠোরতার পাশাপাশি মানবিকতার হাত বাড়িয়ে দেওয়া। হকারদের জন্য সুনির্দিষ্ট নীতিমালার মাধ্যমে এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তোলা হোক, যেখানে পথচারীরাও নির্বিঘ্নে হাঁটতে পারবেন এবং একজন হকারও সম্মানের সাথে তার পরিবারের জন্য দু’মুঠো অন্ন জোগাড় করতে পারবেন।

সম্পর্কিত নিবন্ধ