ঝিকরগাছায় ২ লাখ টাকা চাঁদা না পেয়ে জয়নালকে পিটিয়ে রক্তাক্ত: আতঙ্কে গ্রামছাড়া বহু মানুষ

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার আটুলিয়া গ্রাম এখন একদল চিহ্নিত সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ ও মাদক কারবারির হাতে পুরোপুরি জিম্মি হয়ে পড়েছে। দীর্ঘদিন ধরে চাঁদাবাজি, জমি জবরদখল এবং সাধারণ কৃষকের ফসল ও গবাদিপশু লুটপাট সেখানে নিত্যদিনের স্বাভাবিক চিত্রে পরিণত হয়েছে। এই বেপরোয়া অপরাধী চক্রটির সর্বশেষ বর্বরতার শিকার হয়েছেন জয়নাল হোসেন (৫৫) নামের এক নিরীহ স্থানীয় বাসিন্দা। দাবি অনুযায়ী ২ লাখ টাকা বা প্রায় $১,৭০০ মার্কিন ডলার চাঁদা দিতে না পারায় সন্ত্রাসীরা তাঁর বসতবাড়িতে ঢুকে মধ্যযুগীয় কায়দায় পিটিয়ে তাঁকে রক্তাক্ত করেছে। বর্তমানে তিনি যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের পুরুষ সার্জারি ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

হাসপাতালের বিছানায় যন্ত্রণায় কাতরাতে কাতরাতে আহত জয়নাল ঘটনার রোমহর্ষক বর্ণনা দেন। তিনি আটুলিয়া গ্রামের মৃত হেদায়েতুল্লাহর ছেলে। জয়নাল জানান, গত ২৮ সেপ্টেম্বর রাত ৮টার দিকে একই গ্রামের আব্দুলের ছেলে লতা (৪০) হঠাৎ তাঁর পথ আটকে দাঁড়ায় এবং সোজা ২ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে। জয়নাল এই অন্যায্য ও অনৈতিক দাবির তীব্র প্রতিবাদ জানান এবং কোনো টাকা দিতে পারবেন না বলে পরিষ্কার জানিয়ে দেন। চাঁদা না পেয়ে লতা চরম ক্ষিপ্ত হয় এবং তাঁকে প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। এই ঘটনার পর থেকেই জয়নাল ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা এক অজানা আতঙ্কের মধ্যে রাত কাটাচ্ছিলেন।

সেই হুমকির জের ধরে গত বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) রাত ১০টার দিকে লতা দলবল নিয়ে অস্ত্রশস্ত্রসহ জয়নালের বাড়িতে হামলা চালায়। হামলাকারী সন্ত্রাসীদের দলে ছিল মৃত রবিউলের ছেলে মনিরুল (৩৫) ও বিল্লালের ছেলে মানিকসহ আরও কয়েকজন চিহ্নিত অপরাধী। তারা জয়নালের বসতঘরের দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে পড়ে এবং কোনো কথা না বলেই তাঁকে এলোপাতাড়ি কিল-ঘুষি মারতে থাকে। একপর্যায়ে ভারী কাঠের বাটাম ও লাঠিসোঁটা দিয়ে তাঁর মাথায় ও পিঠে আঘাত করতে থাকে। জয়নালের আর্তচিৎকার শুনে পরিবারের সদস্যরা তাঁকে বাঁচাতে এগিয়ে এলে সন্ত্রাসীরা তাঁদেরও ধাক্কা মেরে মাটিতে ফেলে দেয়। আশপাশের প্রতিবেশীরা জড়ো হতে শুরু করলে সন্ত্রাসীরা ফের হত্যার হুমকি দিয়ে দ্রুত পালিয়ে যায়।

ঘটনার পরপরই রক্তাক্ত অবস্থায় স্বজনরা জয়নালকে উদ্ধার করে দ্রুত যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে আসেন। জরুরি বিভাগের দায়িত্বরত চিকিৎসকরা তাঁকে ভর্তি করে পুরুষ সার্জারি ওয়ার্ডে পাঠান। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, পিটুনিতে জয়নালের শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুরুতর রক্তজমাট ও ক্ষতের সৃষ্টি হয়েছে। তবে অনেক রক্তক্ষরণ হলেও সৌভাগ্যবশত তাঁর অবস্থা এখন আশঙ্কামুক্ত বলে নিশ্চিত করেছেন চিকিৎসকেরা।

আটুলিয়া গ্রামে সন্ত্রাসীদের এমন তাণ্ডব এবারই প্রথম নয়। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, এই মাদক সিন্ডিকেটটি দীর্ঘদিন ধরে গ্রামের নিরীহ মানুষদের নিশানা বানিয়ে একের পর এক চাঁদাবাজি চালিয়ে আসছে। এই চক্রের ধারাবাহিক জুলুমের শিকার হয়েছেন ফার্নিচার ব্যবসায়ী মোমিনুর, কৃষক মিন্টু, পুনু ও খায়ের। জীবন বাঁচাতে তাঁরা ইতিমধ্যে দফায় দফায় চাঁদার টাকা পরিশোধ করতে বাধ্য হয়েছেন। অভিযোগ রয়েছে, এই চক্রের সদস্যদের কাউকে কাউকে ভুক্তভোগীরা ১০ বারেরও বেশি চাঁদা দিয়েছেন। সন্ত্রাসীদের দাবি পূরণ করতে গিয়ে অনেকে সহায়-সম্বল হারিয়ে সম্পূর্ণ নিঃস্ব হয়ে গেছেন।

চাঁদাবাজদের অব্যাহত হুমকি ও মারধরের মুখে ব্যবসা ও ভিটেমাটি ফেলে গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন ফার্নিচার ব্যবসায়ী মোমিনুর, মিন্টু ও খায়েরসহ একাধিক ব্যক্তি। গ্রামবাসীরা জানান, এলাকার প্রায় ৮৫% মানুষ সারাক্ষণ চরম নিরাপত্তাহীনতায় দিন কাটাচ্ছেন। দিনের আলোতেই সন্ত্রাসীরা নিরীহ কৃষকের গোয়াল থেকে গরু-ছাগল ছিনিয়ে নেয় এবং খেতের পাকা ধান ও শাকসবজি প্রকাশ্যে কেটে নিয়ে যায়। কেউ প্রতিবাদ করলে উল্টো মারধর ও মিথ্যা মামলার শিকার হতে হয়। কারণ অপরাধীরা সব সময় কোমরে ধারালো অস্ত্র ও পিস্তল গুঁজে প্রকাশ্যে দাপটের সাথে এলাকায় ঘুরে বেড়ায়।

গ্রামবাসীর সুস্পষ্ট অভিযোগ, চিহ্নিত এই মাদক কারবারি ও চাঁদাবাজরা স্থানীয় একটি প্রভাবশালী রাজনৈতিক মহলের ছত্রছায়ায় রয়েছে। রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে স্থানীয় থানা-পুলিশও এদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না। বারবার থানায় ধরনা দিয়েও কোনো প্রতিকার না মেলায় সাধারণ মানুষের কাছে আইন যেন এক শুভঙ্করের ফাঁকিতে পরিণত হয়েছে। অবিলম্বে ঝিকরগাছা থানা ও জেলা পুলিশের কঠোর হস্তক্ষেপে লতা, মনিরুল ও মানিকসহ পুরো সন্ত্রাসী চক্রকে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির জোর দাবি তুলেছেন আটুলিয়া গ্রামের সর্বস্তরের মানুষ।

সম্পর্কিত নিবন্ধ