মিরপুরে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলার ঘটনায় পদত্যাগ করলেন বিএনপির এমপি মিষ্টি, আসন শূন্য

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

রাজধানীর মিরপুরে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে বর্বরোচিত হামলা, লুটপাট ও ভবন গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় তোলপাড়ের মধ্যে পদত্যাগ করেছেন সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি। আজ বৃহস্পতিবার বেলা পৌনে দুইটার দিকে তিনি জাতীয় সংসদ ভবনে গিয়ে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের হাতে সরাসরি পদত্যাগপত্র তুলে দেন। পদত্যাগপত্র গ্রহণের পরপরই জাতীয় সংসদ সচিবালয় তাঁর সংরক্ষিত মহিলা আসন-২৩ শূন্য ঘোষণা করে আনুষ্ঠানিক গেজেট প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। দলীয় হাইকমান্ডের কঠোর চাপের মুখে শপথ নেওয়ার মাত্র পাঁচ মাসের মাথায় তিনি সংসদ থেকে বিদায় নিতে বাধ্য হলেন।

স্পিকারের কাছে দেওয়া পদত্যাগপত্রে ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি উল্লেখ করেন, তিনি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত মহিলা আসনের একজন সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। চিঠিতে তিনি লিখেছেন, তিনি সম্পূর্ণ সজ্ঞানে ও স্বেচ্ছায় জাতীয় সংসদের সদস্য পদ থেকে পদত্যাগ করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। পদত্যাগপত্রটি দ্রুত গ্রহণ করে তা কার্যকর করার জন্য তিনি স্পিকারকে বিশেষ অনুরোধ জানান। পদত্যাগপত্রে তিনি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলার অভিযোগ বা রাজনৈতিক কোনো প্রসঙ্গের উল্লেখ করেননি, বরং অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত ভাষায় নিজের সিদ্ধান্ত জানিয়ে চিঠি শেষ করেন।

দলীয় ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, বুধবার রাতে প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন এবং ফেরদৌসী আহমেদকে তাৎক্ষণিকভাবে পদত্যাগের স্পষ্ট নির্দেশ দেন। দলীয় প্রধানের পক্ষ থেকে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়, বৃহস্পতিবার সকালের মধ্যে পদত্যাগপত্র জমা না দিলে তাঁকে দল থেকে আজীবনের জন্য বহিষ্কারসহ আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সাধারণ মানুষের জানমালের ক্ষতি ও স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে হামলার সঙ্গে জড়িতদের ব্যাপারে বিএনপি ১০০% কঠোর অবস্থান নেবে—এই কঠোর বার্তার পরই দ্রুত পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নেন মিষ্টি।

সংবিধান অনুযায়ী জাতীয় সংসদে মোট ৫০টি সংরক্ষিত নারী আসন রয়েছে, যা সাধারণ নির্বাচনে দলগুলোর সরাসরি বিজয়ী সংসদ সদস্যদের শতকরা হারের ভিত্তিতে বণ্টিত হয়। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ায় বিএনপি একাই পায় ৩৬টি আসন, যা মোট সংরক্ষিত নারী আসনের ৭২% শতাংশ। গত ৩০ এপ্রিল নির্বাচন কমিশন এই সংসদ সদস্যদের আনুষ্ঠানিক গেজেট প্রকাশ করে এবং গত ৩ মে তাঁরা শপথ গ্রহণ করেন। শপথের পর মাত্র পাঁচ মাস পার হতেই নিজ দলের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ও কঠোর অবস্থানের মুখে ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির সংসদ সদস্য পদের সমাপ্তি ঘটল।

এই পদত্যাগের নেপথ্যে রয়েছে গত শুক্রবার অর্থাৎ ২৫ সেপ্টেম্বর মিরপুরের রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে ঘটা এক ভয়ংকর তাণ্ডব। ওই দিন সকালে হঠাৎ মুখোশ পরা দুই শতাধিক দুর্বৃত্ত দেশীয় ধারালো অস্ত্র ও বুলডোজার নিয়ে স্বাস্থ্যকেন্দ্রটিতে হামলা চালায়। হামলাকারীরা হাসপাতালের কোটি কোটি টাকার আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম ও গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র লুটপাট করে ভবনটি পুরোপুরি গুঁড়িয়ে দেয়। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দাবি, হামলায় কয়েক লাখ $ ডলার মূল্যের জরুরি মাতৃত্বকালীন স্বাস্থ্যসেবা সামগ্রী নষ্ট ও লুট হয়েছে। দিনের আলোতে এমন দুঃসাহসিক হামলায় রাজধানীজুড়ে তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়।

হাসপাতাল গুঁড়িয়ে দেওয়ার এই নারকীয় ঘটনায় নেপথ্যে থেকে ‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেড’ নামের একটি বিতর্কিত সংগঠনের নাম উঠে আসে। মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানে জানা যায়, সংগঠনটির পেছনে স্থানীয় বিএনপির কয়েকজন প্রভাবশালীর হাত রয়েছে। বিশেষ করে ২০০৬ সালে শাহ আলী থানার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের কমিশনার থাকাকালে ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি ওই সমবায় সমিতির সভাপতির দায়িত্বে ছিলেন। সেই সময় রাড্ডা সেন্টারের মূল্যবান সরকারি জমি সমিতির নামে বরাদ্দ চেয়ে জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের কাছে যে আবেদন করা হয়েছিল, তাতে সভাপতি হিসেবে মিষ্টির নিজের স্বাক্ষর রয়েছে।

স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলার মতো ন্যক্কারজনক ঘটনায় দলীয় সংসদ সদস্যের অতীত ও বর্তমান সংশ্লিষ্টতা সামনে আসতেই সাধারণ মানুষের পাশাপাশি বিএনপির অভ্যন্তরেও চরম অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল। সরকারপ্রধানের কঠোর হস্তক্ষেপে এই সংসদ সদস্যের পদত্যাগ সমাজে একটি ইতিবাচক বার্তা দিয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, দলীয় পরিচয় ব্যবহার করে চাঁদাবাজি, জবরদখল কিংবা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়ালে যে দলের কোনো আশ্রয় মিলবে না, এই পদক্ষেপ তারই এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করল। পুলিশ জানিয়েছে, স্বাস্থ্যকেন্দ্র ধ্বংসের এই অপরাধমূলক ঘটনায় জড়িত অন্য কাউকেই কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।

সম্পর্কিত নিবন্ধ