দামুড়হুদায় সুবিধাবঞ্চিত মানুষের মুখে হাসি: ০৬ নং হাউলী ইউনিয়নে উন্নয়ন সামগ্রী ও শিক্ষা উপকরণ বিতরণ

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদা উপজেলায় সুবিধাবঞ্চিত প্রান্তিক মানুষের আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টি ও কোমলমতি শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় বাড়তি উৎসাহ জোগাতে নানা ধরনের উন্নয়ন সামগ্রী এবং শিক্ষা উপকরণ বিতরণ করেছে স্থানীয় প্রশাসন। উপজেলার ০৬ নম্বর হাউলী ইউনিয়ন পরিষদের উদ্যোগে ২০২৫–২৬ অর্থবছরের ইউনিয়ন পরিষদ উন্নয়ন সহায়তা তহবিলের আওতায় এই জনকল্যাণমুখী কার্যক্রম সম্পন্ন হয়। মঙ্গলবার ২৯ সেপ্টেম্বর ইউনিয়ন পরিষদ প্রাঙ্গণে আয়োজিত এক বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর হাতে এসব সামগ্রী তুলে দেওয়া হয়। উৎসবমুখর পরিবেশে এলাকার শত শত সাধারণ মানুষ এই বিশেষ আয়োজন উপভোগ করেন এবং প্রশাসনের এমন মানবিক উদ্যোগে এলাকায় ব্যাপক আনন্দ ও স্বস্তি ছড়িয়ে পড়ে।

ইউনিয়ন পরিষদ সূত্র জানায়, এলাকার গ্রামীণ নারীদের আর্থিক সচ্ছলতা ফেরাতে বিতরণ করা হয়েছে সেলাই মেশিন। এর মাধ্যমে পিছিয়ে পড়া নারীরা ঘরে বসেই কাজ করে তাদের পারিবারিক আয় অন্তত ৪০% থেকে ৫০% পর্যন্ত বাড়াতে পারবেন। কৃষকদের মাঠে কীটনাশক ও সার ছিটানোর কাজ সহজ করতে দেওয়া হয়েছে আধুনিক স্প্রে মেশিন। এতে কৃষকদের উৎপাদন খরচ অনেকটাই কমে আসবে। পাশাপাশি গ্রামীণ স্বাস্থ্য সুরক্ষায় ক্লিনিকগুলোর জন্য বিভিন্ন জরুরি চিকিৎসা সামগ্রী এবং প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের মেধাবী শিক্ষার্থীদের হাতে নতুন স্কুল ব্যাগ ও টিফিন বক্স তুলে দেওয়া হয়।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন দামুড়হুদা উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) লাভলী ইয়াসমিন। তিনি উপস্থিত সবার উদ্দেশ্যে বলেন, গ্রামীণ জনপদের মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন, নারীদের স্বাবলম্বী করা এবং একটি সুশিক্ষিত প্রজন্ম গড়ে তোলাই প্রশাসনের মূল লক্ষ্য। তিনি জানান, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়াতে বর্তমান প্রশাসন শতভাগ আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছে। এসব সামগ্রী সঠিকভাবে কাজে লাগালে গ্রামের অর্থনীতি মজবুত হবে এবং স্কুল ব্যাগ ও টিফিন বক্স পেয়ে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা পড়াশোনায় আগের চেয়ে দ্বিগুণ উৎসাহ পাবে।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) দামুড়হুদা উপজেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক মোঃ রফিকুল হাসান (তনু)। তিনি বলেন, গ্রামীণ উন্নয়ন তখনই টেকসই ও কার্যকর হয়, যখন সরকারি বরাদ্দের প্রতিটি পয়সা কোনো ধরনের অনিয়ম ছাড়া সরাসরি প্রকৃত দরিদ্র মানুষের কাছে পৌঁছায়। প্রান্তিক মানুষের ভাগ্য বদলাতে প্রতিটি ইউনিয়ন পরিষদকে আরও বেশি স্বচ্ছ ও জনবান্ধব হতে হবে। রাজনৈতিক ভেদাভেদ ভুলে সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং শিক্ষায় তরুণদের ধরে রাখাই আমাদের প্রধান দায়িত্ব হওয়া উচিত বলে তিনি মন্তব্য করেন।

হাউলী ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মোঃ নিজাম উদ্দীনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে স্থানীয় পর্যায়ের কর্মকর্তারা কার্যক্রমের বিস্তারিত তুলে ধরেন। পরিষদের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মোঃ মনিরুজ্জামান এবং হিসাব সহকারী মোঃ সাজিবুল ইসলাম মিলন জানান, ২০২৫–২৬ অর্থবছরের বাজেট থেকে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় সুবিধাভোগী বাছাই করা হয়েছে। কোনো ধরনের স্বজনপ্রীতি ছাড়াই প্রকৃত দুস্থ পরিবার, প্রান্তিক কৃষক এবং নিয়মিত স্কুলে যাওয়া শিক্ষার্থীদের এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। স্থানীয় ইউপি সদস্য ও গ্রাম পুলিশের সদস্যরাও পুরো বিতরণ প্রক্রিয়ায় সার্বিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে দায়িত্ব পালন করেন।

অর্থনীতিবিদদের মতে, তৃণমূল পর্যায়ে এ ধরনের সহায়তা গ্রামীণ কুটির শিল্পকে চাঙ্গা করে তোলে। সেলাইয়ের কাজ করে নারীরা তৈরি পোশাক খাত ও স্থানীয় বাজারে পণ্য জোগান দিতে পারেন, যা জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এমনকি হস্তশিল্পের মতো পণ্যের চাহিদা বাড়লে তা পরোক্ষভাবে বৈদেশিক মুদ্রা বা ডলার ($) আয়েও ভূমিকা রাখতে পারে। অনুষ্ঠানে বিনামূল্যে সেলাই মেশিন পাওয়া এক নারী আবেগাপ্লুত হয়ে জানান, তাঁর স্বামীর একার উপার্জনে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছিল। এখন তিনি ঘরে বসেই আয় করে সন্তানদের পড়াশোনার খরচ জোগাতে পারবেন।

অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের হাতে উজ্জ্বল রঙের স্কুল ব্যাগ ও স্বাস্থ্যসম্মত টিফিন বক্স তুলে দেন অতিথিরা। নতুন উপকরণ পেয়ে শিশুদের মুখে ফুটে ওঠে অমলিন হাসি। অনুষ্ঠানে এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি এবং বিপুলসংখ্যক সুবিধাভোগী নারী-পুরুষ উপস্থিত ছিলেন। স্থানীয়রা মনে করছেন, নিয়মিত এ ধরনের সামাজিক কার্যক্রম পরিচালনা করলে হাউলী ইউনিয়নের অন্তত ৮০% অতিদরিদ্র পরিবার নিজেদের পায়ে দাঁড়াতে পারবে। এতে একদিকে যেমন শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার হার কমে আসবে, তেমনি গ্রামীণ জনপদে তৈরি হবে অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতার নতুন দিগন্ত।

সম্পর্কিত নিবন্ধ