আদাবরে বাড়ি দখল ও চাঁদাবাজির মামলায় পুলিশের গুলিতে আহত ২, অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার ৪

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

রাজধানীর আদাবরে একটি বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর ও চাঁদাবাজির মামলায় জড়িত সন্ত্রাসী চক্রকে ধরতে গিয়ে মধ্যরাতে সশস্ত্র সংঘাতের মুখে পড়েছে পুলিশ। অভিযানে আসামিরা ধারালো অস্ত্র নিয়ে পুলিশের ওপর চড়াও হলে আত্মরক্ষার্থে পুলিশ পাল্টা গুলি চালায়। এতে দুই সন্ত্রাসী পায়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত হন। পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে ওই দুই আহত ব্যক্তি ছাড়াও আরও দুজনকে হাতেনাতে গ্রেপ্তার করেছে। এ নিয়ে আলোচিত এই মামলায় এখন পর্যন্ত মোট ১০ জন আসামিকে আইনের আওতায় আনা হলো। ঘটনার পর নবোদয় হাউজিং ও আশপাশের এলাকায় সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক কিছুটা কমলেও মোহাম্মদপুর-আদাবরের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ কাটছে না।

আদাবর থানা-পুলিশ সূত্রে জানা যায়, গোপন তথ্যের ভিত্তিতে সোমবার দিবাগত রাত আড়াইটার দিকে নবোদয় হাউজিং এলাকার কাঁচাবাজারসংলগ্ন খেলার মাঠের পেছনে খালের পাড়ে ফাঁকা জায়গায় অভিযান চালায় পুলিশ। সেখানে ৭ থেকে ৮ জন চিহ্নিত সন্ত্রাসী গোপন বৈঠকে জড়ো হয়েছিল। পুলিশ তাঁদের চারদিক থেকে ঘিরে ফেললে সন্ত্রাসীরা দেশীয় ধারালো চাপাতি ও সামুরাই উঁচিয়ে পুলিশের ওপর সরাসরি হামলার চেষ্টা করে। বিপদের মুখে তাৎক্ষণিক আত্মরক্ষার জন্য অভিযানে অংশ নেওয়া কনস্টেবল তাঁর শটগান থেকে ২ রাউন্ড গুলি ছোড়েন। এতে দুই সন্ত্রাসী গুলিবিদ্ধ হন এবং বাকিরা অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে দ্রুত পালিয়ে যান।

গুলিবিদ্ধ দুজন হলেন ৩০ বছর বয়সী রাজিব হাওলাদার এবং ২৪ বছর বয়সী সাগর। তাঁদের দুজনেরই পায়ে গুলি লেগেছে। পুলিশ তাঁদের দ্রুত উদ্ধার করে চিকিৎসার জন্য শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠায়। এ ছাড়া ঘটনাস্থল থেকে ২৩ বছর বয়সী শাকিব এবং ২৪ বছর বয়সী রাশেদ নামের আরও দুই তরুণকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তল্লাশি চালিয়ে ঘটনাস্থল থেকে সন্ত্রাসীদের ফেলে যাওয়া ধারালো চাপাতি, বিদেশি সামুরাই ও কিরিচ উদ্ধার করা হয়। পুলিশ জানিয়েছে, পালিয়ে যাওয়া বাকি সন্ত্রাসীদের ধরতে এলাকায় চিরুনি অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

এই ঘটনার সূত্রপাত গত রোববার। আদাবরের শ্যামলী হাউজিং এলাকার একটি বাড়ি দখলের চেষ্টাকে কেন্দ্র করে প্রকাশ্য দিবালোকে তাণ্ডব চালায় এই সন্ত্রাসী চক্র। অন্তত ১৫ থেকে ২০ জনের একটি সশস্ত্র দল রামদা, চাপাতি ও পিস্তল উঁচিয়ে বাড়িটিতে চড়াও হয়। ভাড়াটিয়াদের ভয়ভীতি দেখিয়ে তারা দাবি করে, ‘বাসায় থাকিস, টাকা দিবি না?’ সন্ত্রাসীরা কয়েক লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে বাড়ির মূল ফটক এলোপাতাড়ি কোপায় এবং সিসিটিভি ক্যামেরা ভেঙে ফেলে। জানা গেছে, বাড়িটির মালিকানা নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে আদালতে দীর্ঘদিন ধরে মামলা চলছে। তবে আদালতের রায় উপেক্ষা করে ভাড়াটে সন্ত্রাসীদের মাধ্যমে বাড়িটি দখলের চেষ্টা করা হচ্ছিল।

গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের অপরাধের ইতিহাস ঘেঁটে পুলিশ চাঞ্চল্যকর তথ্য পেয়েছে। পুলিশ রেকর্ড অনুযায়ী, সাগরের বিরুদ্ধে আদাবর ও মোহাম্মদপুর থানায় মাদক, অস্ত্র ও চাঁদাবাজির অন্তত ৮টি মামলা রয়েছে। অন্যদিকে রাজিব মোহাম্মদপুরের বহুল আলোচিত বাবু হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী। বাকি দুই আসামি শাকিব ও রাশেদের বিরুদ্ধেও মারামারি ও চাঁদাবাজির ৫টি করে মামলা আছে। এই মামলায় পুলিশ এর আগে অভিযান চালিয়ে ৬ জনকে গ্রেপ্তার করেছিল। নতুন চারজনসহ এখন মোট গ্রেপ্তার আসামির সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১০ জনে।

মোহাম্মদপুর ও আদাবর এলাকায় দীর্ঘদিন ধরেই জমি ও বহুতল ভবন দখলবাজদের দৌরাত্ম্য চলছে। ভবন নির্মাণ করতে গেলেই ঠিকাদারদের কাছ থেকে ২০% থেকে ৩০% পর্যন্ত চাঁদা দাবি করে সন্ত্রাসী চক্রগুলো। অনেক ক্ষেত্রে প্রবাসী ফ্ল্যাট মালিকদের কাছ থেকে হাজার ডলার ($) সমমূল্যের অর্থ দাবি করার অভিযোগও উঠেছে। নবোদয় হাউজিংয়ের বাসিন্দারা জানান, খালের পাড়ে সন্ত্রাসীদের এমন প্রকাশ্য আস্তানা সাধারণ নাগরিকদের নিরাপত্তাকে চরম হুমকিতে ফেলেছিল। পুলিশের এই অভিযান কিছুটা স্বস্তি এনে দিলেও স্থায়ী সমাধান চান এলাকাবাসী।

আদাবর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাহিদুল ইসলাম বলেন, সন্ত্রাসীরা চাপাতি নিয়ে হত্যার উদ্দেশ্যে ঝাঁপিয়ে পড়লে পুলিশ আত্মরক্ষার্থে গুলি ছুড়তে বাধ্য হয়। তিনি স্পষ্ট বার্তা দিয়ে জানান, মোহাম্মদপুর বা আদাবরে কোনো বাড়ি দখল কিংবা গুন্ডামি সহ্য করা হবে না। অপরাধীদের রাজনৈতিক পরিচয় যা-ই হোক, তাঁদের ১০০% আইনের আওতায় আনা হবে। পুলিশ মানুষের জানমালের পূর্ণ নিরাপত্তা দেবে। আহত আসামিরা সুস্থ হলে তাঁদের আদালতে তোলা হবে এবং পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায় তাঁদের বিরুদ্ধে নতুন মামলা হচ্ছে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ