মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলায় চা পাতা চুরিতে বাধা দেওয়ায় এক পাহারাদারকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে গুরুতর জখম করেছে একটি সংঘবদ্ধ চোর চক্র। আজ সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬) ভোররাতে উপজেলার শমশেরনগর চা বাগানের অধীনস্থ দেওছড়া ফাঁড়ি চা বাগানে এই বর্বরোচিত হামলার ঘটনা ঘটে। রক্তাক্ত অবস্থায় আহত পাহারাদার রামরাজ গৌড় রাজুকে (৪৫) উদ্ধার করে স্থানীয়রা দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যান। বর্তমানে তিনি আশঙ্কাজনক অবস্থায় চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এই হামলার খবর ছড়িয়ে পড়লে পুরো বাগান এলাকায় চরম ক্ষোভ ও অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে। ঘটনার সঙ্গে জড়িত আসামিদের অবিলম্বে গ্রেপ্তারের দাবিতে সকাল থেকেই কাজ বন্ধ রেখে বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ সভা করেছেন সাধারণ চা শ্রমিকেরা।
বাগান কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় শ্রমিক সূত্রে জানা গেছে, সোমবার ভোর ঠিক ৪টা ৩০ মিনিটের দিকে পার্শ্ববর্তী বস্তির চিহ্নিত চোর লোকমান মিয়া, তাহির মিয়া ও সালমান মিয়াসহ ৫ থেকে ৬ জনের একদল দুর্বৃত্ত দেওছড়া চা বাগানের সেকশনে অনধিকার প্রবেশ করে। তারা দেশীয় ধারালো অস্ত্র সঙ্গে নিয়ে বাগানের গাছ থেকে বস্তাভর্তি করে কাঁচা চা পাতা ছিঁড়ে নেওয়ার চেষ্টা করছিল। এ সময় বাগানের পাহাড়াদার রামরাজ গৌড় তাদের দেখতে পেয়ে চ্যালেঞ্জ করেন এবং পাতা চুরিতে সরাসরি বাধা দেন। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে চোরেরা রামরাজের ওপর ধারালো দা ও লাঠিসোঁটা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে। তারা তাঁর মাথা ও হাতসহ শরীরের বিভিন্ন জায়গায় এলোপাতাড়ি কুপিয়ে রক্তাক্ত জখম করে পালিয়ে যায়।
পরে আশপাশের শ্রমিকেরা দ্রুত এগিয়ে এসে রক্তাক্ত ও সংজ্ঞাহীন অবস্থায় রামরাজকে উদ্ধার করেন। প্রথমে তাঁকে বাগানের চিকিৎসাকেন্দ্র ক্যামেলিয়া হাসপাতালে নেওয়া হয়। কিন্তু শারীরিক অবস্থার মারাত্মক অবনতি ঘটলে কর্তব্যরত চিকিৎসকেরা উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে দ্রুত ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট মৌলভীবাজার জেলা সদর হাসপাতালে রেফার্ড করেন। হাসপাতালের জরুরি বিভাগে তাঁর ক্ষতস্থানে একাধিক সেলাই দিতে হয়েছে এবং তিনি এখনো পুরোপুরি আশঙ্কামুক্ত নন। দরিদ্র এই চা শ্রমিকের চিকিৎসার খরচ মেটাতে বাগান কর্তৃপক্ষ ও সহকর্মীরা মিলে তাৎক্ষণিকভাবে প্রায় ১৫,০০০ টাকা বা প্রায় $১২৫ ডলারের আর্থিক তহবিল গঠন করেছেন।
সহকর্মীর ওপর এমন নৃশংস হামলার প্রতিবাদে দেওছড়া চা বাগানের শত শত চা শ্রমিক রাস্তায় নেমে আসেন। সকাল ৯টা থেকে তাঁরা কাজ বন্ধ রেখে দেওছড়া কালীমন্দির সংলগ্ন মাঠে এক বিশাল প্রতিবাদ সভা ও বিক্ষোভ সমাবেশ করেন। দেওছড়া বাগান পঞ্চায়েত সভাপতি শংকর রবিদাসের সভাপতিত্বে এবং লছমি মাদ্রাজের পরিচালনায় অনুষ্ঠিত এই প্রতিবাদ সভায় বক্তব্য দেন শমশেরনগর চা বাগানের প্রধান ব্যবস্থাপক কামরুল জামান ও স্থানীয় ইউপি সদস্য ইয়াকুব মিয়া। সভায় আরও বক্তব্য রাখেন নমিতা সিং, মোহনলাল রবিদাস, পঞ্চায়েত সম্পাদক লক্ষ্মীনারায়ণ রবিদাস ও বাগান স্টাফ দিলীপ নাইডু।
প্রতিবাদ সভায় বক্তারা স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ ও জনপ্রতিনিধিদের সমন্বয়ে চোর চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার জোর দাবি জানান। শ্রমিক নেতারা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, আগামী ৭ দিনের মধ্যে হামলাকারীদের গ্রেপ্তার না করলে দেওছড়া চা বাগানের ভেতর দিয়ে যাওয়া বস্তিবাসীদের চলাচলের রাস্তা পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হবে। স্থানীয় শ্রমিকেরা জানান, রাতের আঁধারে চোরেরা টিলার চা গাছ ভেঙে পাতা কেটে নেওয়ায় গাছগুলোর প্রায় ৬০% থেকে ৭০% নষ্ট হয়ে যায়। এতে পরদিন সকালে নারী শ্রমিকেরা পাতা তুলতে এসে কাঁচা পাতা পান না এবং তাঁদের দৈনিক ‘নিরিখ’ বা নির্ধারিত কাজের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ ব্যাহত হয়। ফলে তাঁদের দৈনিক মজুরি প্রায় ৩০% থেকে ৪০% কমে যাচ্ছে।
হামলার বিষয়ে শমশেরনগর পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ (ওসি) রুহুল আমিন ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, খবর পাওয়ার পরপরই পুলিশের একটি বিশেষ দল ঘটনাস্থল ও হাসপাতাল পরিদর্শন করেছে। চা বাগান কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে থানায় একটি নিয়মিত ফৌজদারি মামলার প্রস্তুতি চলছে। তিনি স্পষ্ট জানান, অপরাধীদের কোনো প্রকার ছাড় দেওয়া হবে না। পাহারাদার রামরাজের ওপর হামলায় জড়িত চোর চক্রের সদস্যদের গ্রেপ্তার করতে পুলিশ ইতিমধ্যেই সম্ভাব্য সব আস্তানায় অভিযান শুরু করেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে চা বাগান এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশি নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। একই সাথে শ্রমিকদের শান্ত থেকে কাজে ফেরার আহ্বান জানিয়েছে পুলিশ।
















