ভারতের পশ্চিমবঙ্গের ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান কলকাতার সত্যজিৎ রায় ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউটে (এসআরএফটিআই) একটি বিতর্কিত অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে। রবিবার (২৭ সেপ্টেম্বর) প্রতিষ্ঠানটির প্রেক্ষাগৃহে হিন্দুত্ববাদী সংগঠন ‘অখিল ভারতীয় গ্রাহক পঞ্চায়েতের’ কর্মীদের সঙ্গে সাধারণ শিক্ষার্থীদের রক্তক্ষয়ী এই সংঘর্ষ বাঁধে। হামলায় প্রতিষ্ঠানের একাধিক শিক্ষক ও বহু শিক্ষার্থী গুরুতর আহত হয়েছেন। পরিস্থিতি এতটাই বেগতিক রূপ নেয় যে, শেষ পর্যন্ত পাঁচিল টপকে ক্যাম্পাসে ঢুকে লাঠিচার্জ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে কলকাতা পুলিশ। রবিবার রাত ৯টা পর্যন্ত পুরো চত্বরে থমথমে উত্তেজনা বিরাজ করছিল।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, রবিবার বিকেলে এসআরএফটিআইয়ের মূল মিলনায়তন ভাড়া নিয়ে একটি বিশেষ সভার আয়োজন করে অখিল ভারতীয় গ্রাহক পঞ্চায়েত (এবিজিপি)। প্রতিষ্ঠানের ভেতরে রাজনৈতিক মতাদর্শভিত্তিক এমন বিতর্কিত অনুষ্ঠান আয়োজন নিয়ে শুরু থেকেই সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ ছিল। শিক্ষার্থীরা মিলনায়তনে গিয়ে আয়োজকদের কাছে সরাসরি জানতে চান, একটি বিশেষায়িত চলচ্চিত্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মঞ্চ কেন রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করতে দেওয়া হলো? এই নিয়ে উভয় পক্ষের মধ্যে তীব্র কথা-কাটাকাটি শুরু হয় এবং একপর্যায়ে তা চরম মারামারিতে রূপ নেয়।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, মিলনায়তনের ভেতর থেকে বহিরাগত কর্মীরা সংঘবদ্ধ হয়ে সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের ওপর লাঠিসোঁটা নিয়ে চড়াও হয়। এতে বেশ কয়েকজন নারী শিক্ষার্থী গুরুতর লাঞ্ছনার শিকার হন। এমনকি এক ছাত্রের ওপর ধারালো ছুরি চালানো হয়েছে বলেও প্রত্যক্ষদর্শীরা নিশ্চিত করেছেন। মারধরের সময় হামলাকারীরা শিক্ষার্থীদের লক্ষ্য করে ‘দেশবিরোধী’, ‘নকশাল’, ‘জঙ্গি’ ও ‘বাংলাদেশি’ বলে গালিগালাজ করে। উল্লেখ্য, বিশ্বমানের চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন বিষয়ক পড়াশোনার জন্য এসআরএফটিআই ক্যাম্পাসে বহু বাংলাদেশি শিক্ষার্থী নিয়মিত পড়াশোনা করেন। বিদেশি শিক্ষার্থীদের প্রায় ১৫% থেকে ২০% বাংলাদেশ থেকে যাওয়া তরুণ। এমন উগ্র রাজনৈতিক বিদ্বেষ ও হুমকিতে ক্যাম্পাসে অধ্যয়নরত বাংলাদেশি ছাত্রছাত্রীদের নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
এদিকে অভিযোগ অস্বীকার করে পাল্টা দাবি তুলেছেন অনুষ্ঠান আয়োজকেরা। এবিজিপি নেতৃত্বের বক্তব্য, তারা প্রায় ৫০,০০০ রুপি বা প্রায় $৫৫০ ডলারের সমপরিমাণ অর্থ দিয়ে সম্পূর্ণ নিয়মতান্ত্রিকভাবে প্রেক্ষাগৃহটি ভাড়া নিয়েছিলেন। তাদের অভিযোগ, পূর্বপরিকল্পিতভাবে বামপন্থী শিক্ষার্থীরা তাদের শান্তিপূর্ণ অনুষ্ঠানে হানা দিয়ে পোস্টার-ব্যানার ছিঁড়ে ফেলে এবং স্বামী বিবেকানন্দের ছবি ভাঙচুর করে। আয়োজকদের দাবি, শিক্ষার্থীদের অতর্কিত হামলায় তাদের নিজস্ব ৪ জন কর্মী গুরুতর আহত হয়ে বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন।
পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে এসআরএফটিআই চত্বরে বিপুলসংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করা হয়। প্রথমে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ ক্যাম্পাসের ভেতরে পুলিশ প্রবেশের আনুষ্ঠানিক অনুমতি দেয়নি। তবে ক্যাম্পাসের ভেতর চিৎকার ও মারামারি বাড়তে থাকায় খোদ কলকাতা পুলিশের উপকমিশনার বা ডিসি (পূর্ব) নিজেই প্রাচীর টপকে ভেতরে প্রবেশ করেন। এরপর সশস্ত্র পুলিশ দল ক্যাম্পাসে ঢুকে আহত শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের উদ্ধার করে প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করে। বাইরে জড়ো হওয়া উৎসুক জনতাকে সরিয়ে দিয়ে রাতে ক্যাম্পাসের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেয় পুলিশ।
পশ্চিমবঙ্গে সাম্প্রতিক সময়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে উগ্র রাজনীতির অনুপ্রবেশ আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। কিছুদিন আগেই স্কটিশ চার্চ কলেজে নরেন্দ্র মোদির প্রশাসনিক জীবনের ২৫ বছর পূর্তির নাটক করতে না চাওয়ায় শিক্ষার্থীদের ওপর চাপ তৈরির অভিযোগ ওঠে। যদিও কলেজের অধ্যক্ষ মধুমঞ্জরী মণ্ডল এই অভিযোগ অস্বীকার করেছিলেন। এর আগে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে বামপন্থী छात्रসংগঠন ও বিজেপি সমর্থিত এবিভিপির সংঘাতের রাতে হঠাৎ উপস্থিত হয়ে তীব্র বিতর্ক সৃষ্টি করেন বিজেপি বিধায়ক শর্বরী ভট্টাচার্য। সেই ঘটনার জেরে বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বে ৩ কিলোমিটার দীর্ঘ ‘গেরুয়া সম্মান যাত্রা’ নামক পদযাত্রায় নাগা সন্ন্যাসীদের উপস্থিতি পুরো রাজ্যে তোলপাড় তোলে।
এসআরএফটিআইয়ের মতো ঐতিহ্যবাহী ও বিশেষায়িত স্বশাসিত প্রতিষ্ঠানেও এই ধরনের রাজনৈতিক তাণ্ডব দেখে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছে পশ্চিমবঙ্গের বুদ্ধিজীবী ও শিক্ষকমহল। বিশিষ্ট চলচ্চিত্র নির্মাতাদের মতে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ দিন দিন দুর্বল হয়ে পড়ার সুযোগেই বহিরাগত উগ্র রাজনৈতিক শক্তি ক্যাম্পাসে অনায়াসে ঢুকে পড়ার সাহস পাচ্ছে। এই ধরনের সহিংসতা শিক্ষা পরিবেশকে প্রায় শতভাগ (১০০%) কলুষিত করছে এবং প্রতিষ্ঠানের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করছে।
ঘটনার পর আহত শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা হামলাকারীদের অবিলম্বে গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। একই সাথে ক্যাম্পাসে বহিরাগত রাজনৈতিক সংগঠনের অপতৎপরতা চিরতরে বন্ধের আহ্বান জানান তারা। অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে ক্যাম্পাস চত্বরে এখনও সশস্ত্র পুলিশ মোতায়েন রয়েছে।
















