যশোরে অনলাইন হ্যাকিং ও জাল নথি তৈরির চক্রের চার সদস্য আটক: বিদেশি লাইসেন্স ও সরঞ্জাম উদ্ধার

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

যশোর শহরের ব্যস্ততম রেলবাজার এলাকায় বিশেষ অভিযান চালিয়ে একটি সংঘবদ্ধ অনলাইন প্রতারণা ও জাল নথি তৈরির চক্রের চার সক্রিয় সদস্যকে হাতেনাতে আটক করেছে আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী এসআরবি-৬। রবিবার (২৭ সেপ্টেম্বর) দুপুরে সুনির্দিষ্ট গোপন তথ্যের ভিত্তিতে রেলবাজার এলাকার একটি ভাড়া বাসায় এই সাঁড়াশি অভিযান চালায় তাদের একটি চৌকস দল। এ সময় আটক ব্যক্তিদের কাছ থেকে বিভিন্ন দেশের জাল ড্রাইভিং লাইসেন্স, ভুয়া ভোটার আইডি কার্ড এবং অনলাইনে এসব জাল কাগজপত্র তৈরির কাজে ব্যবহৃত একাধিক আধুনিক কম্পিউটার, স্ক্যানার ও ডিজিটাল সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়।

আটক ব্যক্তিরা হলেন ঝিনাইদহ সদর উপজেলার বোংকিরা গ্রামের পিকুল বিশ্বাসের ছেলে আল মুছাব্বির রিয়াদ, যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার কলাগাছি গ্রামের ইমান আলীর ছেলে রাসেল হোসেন, ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলার বাতানগাছি গ্রামের শহিদুজ্জামানের ছেলে ফাহিম সাদিক এবং একই উপজেলার জলিলপুর গ্রামের সজল আলীর ছেলে সিয়াম আলী। তাদের বয়স মূলত ২০ থেকে ২৮ বছরের মধ্যে। স্থানীয়ভাবে সাধারণ যুবক মনে হলেও তথ্যপ্রযুক্তির বিশেষ জ্ঞানকে তারা দীর্ঘদিন ধরে মানুষকে ঠকানোর কাজে ব্যবহার করে আসছিলেন।

এসআরবি-৬ সূত্রে জানা গেছে, যশোর শহরের রেলবাজার এলাকার স্থানীয় বাসিন্দা লাল মিয়ার একটি বাড়ি ভাড়া নিয়ে এই চার তরুণ দীর্ঘদিন ধরে তাদের অপকর্মের আস্তানা গড়ে তোলেন। সাধারণ প্রতিবেশীদের কাছে তারা তথ্যপ্রযুক্তি সংক্রান্ত কাজের কথা বললেও আড়ালে মূলত আন্তর্জাতিক সাইবার অপরাধ চালাচ্ছিলেন। তারা বিদেশ যেতে আগ্রহী সাধারণ মানুষকে প্রধান শিকার হিসেবে বেছে নিতেন। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে পাঠানোর স্বপ্ন দেখিয়ে তারা বিপুল অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিতেন।

চক্রটির কাজের ধরন ছিল বেশ সুপরিকল্পিত। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আটক যুবকেরা জানান, তারা ইন্টারনেটের বিভিন্ন অনিরাপদ ওয়েবসাইট থেকে অন্য দেশের নাগরিকদের আসল পরিচয়পত্র, ড্রাইভিং লাইসেন্স ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কার্ডের সংরক্ষিত তথ্য হ্যাক করতেন। পরে উন্নত ফটোশপ সফটওয়্যার ব্যবহার করে বিদেশি নাগরিকদের ছবির জায়গায় বাংলাদেশি কর্মীদের ছবি ও নাম-ঠিকানা নিখুঁতভাবে বসিয়ে দিতেন। এভাবে তৈরি করা শতভাগ (১০০%) ভুয়া নথিকে তারা আসল বলে সরবরাহ করতেন। খালি চোখে এসব জাল কাগজপত্র কারো পক্ষে সহজে ধরা সম্ভব ছিল না।

এই ধরনের একটি নকল ড্রাইভিং লাইসেন্স বা ভুয়া নথির বিনিময়ে তারা একেকজন প্রবাসীর কাছ থেকে ৫০,০০০ থেকে ৮০,০০০ টাকা বা প্রায় $৫০০ থেকে $৭০০ ডলার পর্যন্ত নিতেন। চক্রটি আশ্বাস দিত যে, এই বিদেশি লাইসেন্স থাকলে বিদেশে পৌঁছামাত্র সরাসরি ৮০% বেশি বেতনের চাকরি মিলবে। এমন মিথ্যা লোভে পড়ে বহু বেকার যুবক ভিটেমাটি বিক্রি করে প্রতারিত হয়েছেন। প্রতারক দলটি অবৈধ আয়ের প্রায় ৬০% খরচ করত আধুনিক প্রযুক্তি কিনতে ও নিজেদের ব্যক্তিগত বিলাসবহুল জীবনযাপনে।

এসআরবি-৬ যশোরের কোম্পানি কমান্ডার মেজর এটিএম ফজলে রাব্বি প্রিন্স জানান, এই চক্রের বিরুদ্ধে অনলাইনে আর্থিক প্রতারণা, আইডি হ্যাকিং ও জাল নথি তৈরির একাধিক সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছিল। দীর্ঘদিন তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় নজরদারি চালিয়ে সত্যতা নিশ্চিত হওয়ার পর রবিবার দুপুরে রেলবাজারের ভাড়া বাসায় দলবলসহ হানা দেয় তাদের দল। অভিযানকালে ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করা হয় একাধিক সিপিইউ, কালার প্রিন্টার, হাই-রেজ্যুলেশন স্ক্যানার এবং জাল নথির ডিজিটাল সফট কপি, যা আসামিদের অপরাধ প্রমাণে বড় ভূমিকা রাখবে।

মেজর প্রিন্স বিদেশগামী সাধারণ মানুষকে সজাগ থাকার অনুরোধ জানিয়ে বলেন, কোনোভাবেই দালালদের মিষ্টি কথায় ভুলে বা স্বল্প সময়ে অতিরিক্ত আয়ের আশায় ভুয়া কাগজপত্র সংগ্রহ করা উচিত নয়। আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বা কর্মস্থলে এসব জাল নথি ধরা পড়লে সরাসরি কারাবাস ও দেশে ফেরত আসার ঝুঁকি থাকে। তিনি সবাইকে সরকারের অনুমোদিত বৈধ চ্যানেলে কাগজপত্র যাচাই করে নেওয়ার পরামর্শ দেন।

আইনশৃংখলা রক্ষাকারী সংস্থাটি আরও জানিয়েছে, আটক চার প্রতারকের বিরুদ্ধে জালিয়াতি ও সাইবার সুরক্ষা আইনে নিয়মিত মামলা দায়ের করা হয়েছে। পরবর্তীতে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য তাদেরকে যশোর কোতোয়ালি মডেল থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে। এই চক্রের পেছনে দেশি-বিদেশি অন্য কোনো গডফাদার বা বড় কোনো সিন্ডিকেট সক্রিয় আছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে তদন্ত অব্যাহত রেখেছে প্রশাসন।

সম্পর্কিত নিবন্ধ