বীরগঞ্জে ৫ লাখ টাকা যৌতুকের দাবিতে গৃহবধূকে গলায় রশি পেঁচিয়ে হত্যাচেষ্টা, স্বামীসহ চারজনের বিরুদ্ধে মামলা

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

দিনাজপুরের বীরগঞ্জে ৫ লাখ টাকা যৌতুক না পেয়ে নুরজাহান জিম নামের এক গৃহবধূকে বেধড়ক মারধরের পর গলায় রশি পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যার চেষ্টা চালিয়েছে তার স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির লোকজন। গত ২৫ সেপ্টেম্বর রাত আনুমানিক সাড়ে ৯টার দিকে উপজেলার রসুলপুর এলাকায় এই নৃশংস ঘটনাটি ঘটে। গুরুতর আহত ও রক্তাক্ত অবস্থায় পরিবারের সদস্যরা গৃহবধূকে উদ্ধার করে বীরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে ভর্তি করেন। চিকিৎসকেরা জানান, রশির তীব্র টানে তার গলায় গভীর অর্ধচন্দ্রাকৃতির মারাত্মক দাগ তৈরি হয়েছে।

ভুক্তভোগীর পরিবার ও এজাহার সূত্রে জানা গেছে, প্রায় ৯ বছর আগে ২০১৭ সালে রসুলপুর এলাকার মো. রাশেদ ইসলামের সঙ্গে পারিবারিকভাবে নুরজাহান জিমের বিয়ে সম্পন্ন হয়। বিয়ের সময় মেয়ের সুখ ও ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে তার বাবা মো. রুহুল আমিন সাধ্যমতো নগদ টাকা, মূল্যবান স্বর্ণালংকার এবং একটি নতুন মোটরসাইকেলসহ নানা আসবাবপত্র যৌতুক হিসেবে দিয়েছিলেন। বর্তমানে তাদের সুখের সংসারে ৫ বছর বয়সী একটি ফুটফুটে মেয়ে এবং ৩ বছর বয়সী একটি নিষ্পাপ ছেলেসন্তান রয়েছে।

অভিযোগে জানা যায়, সন্তান জন্মের পর থেকেই স্বামী রাশেদ ইসলাম বাবার বাড়ি থেকে অতিরিক্ত ৫ লাখ টাকা যৌতুক দাবি করে আসছিলেন, যা বর্তমান আন্তর্জাতিক মুদ্রায় প্রায় $৪,১৫০ ডলারের সমান। দরিদ্র বাবার পক্ষে এই বিপুল অঙ্কের অর্থ দেওয়া কোনোভাবেই সম্ভব ছিল না। পরিবারের নিত্যদিনের অভাব-অনটন ও প্রায় ৮০% বাড়তি পারিবারিক খরচের কারণে বাবার বাড়ি থেকে টাকা আনতে সরাসরি অস্বীকৃতি জানান নুরজাহান। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে স্বামীসহ শ্বশুরবাড়ির অন্যান্য সদস্যরা নিয়মিত তার ওপর অমানবিক শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালাতেন।

দিনের পর দিন চলা এই নির্যাতনের ধারাবাহিকতায় গত ১৮ সেপ্টেম্বর সকাল ১০টার দিকে রাশেদ টাকা এনে দেওয়ার জন্য আবারও প্রচণ্ড চাপ তৈরি করেন। নুরজাহান এতে রাজি না হওয়ায় স্বামী একটি বাঁশের লাঠি দিয়ে তাকে বেদম পেটাতে থাকেন। একপর্যায়ে মারধর করে দুই শিশুসন্তানসহ তাকে এক কাপড়ে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেন। চরম অসুস্থ অবস্থায় তিনি বাবার বাড়িতে গিয়ে আশ্রয় নেন এবং বীরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নেন। পরে আইনি সহায়তার আশায় তিনি সরকারি লিগ্যাল এইডে লিখিত অভিযোগ দাখিল করেন।

লিগ্যাল এইডে অভিযোগ দায়ের করায় রাশেদ ও তার পরিবারের ক্ষোভ আরও বেড়ে যায়। এজাহারের বিবরণ অনুযায়ী, গত ২৫ সেপ্টেম্বর রাত আনুমানিক সাড়ে ৯টার দিকে নুরজাহানের বাবার বাড়ির লোকজন রাতের খাবার খাওয়ার কাজে ব্যস্ত ছিলেন। ঠিক এই সুযোগে স্বামী রাশেদ কৌশলে নুরজাহানকে ডেকে বাড়ির বাইরে নিয়ে আসেন। এরপর অভিযুক্তরা দলবদ্ধভাবে তার মুখ চেপে ধরে জোরপূর্বক টেনেহিঁচড়ে বাড়ির পশ্চিম পাশের একটি নির্জন পুকুরপাড়ের আমগাছের নিচে নিয়ে যান।

সেখানে পৌঁছানোর পর অভিযুক্তরা নুরজাহানকে এলোপাতাড়ি মারধর করতে শুরু করেন। একপর্যায়ে রাশেদ তার সঙ্গে থাকা একটি শক্ত রশি বের করে নুরজাহানের গলায় পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যার চেষ্টা চালান। তখন মৃত্যুর মুখে পড়ে নুরজাহান বিকট চিৎকার দিলে তার বাবা রুহুল আমিন ও আশপাশের প্রতিবেশীরা দ্রুত সেদিকে ছুটে আসেন। মানুষজন এগিয়ে আসতে দেখে অভিযুক্তরা রশি ফেলে দ্রুত ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়। স্থানীয়দের তাৎক্ষণিক উপস্থিতিতে গৃহবধূ নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে যান।

পালিয়ে যাওয়ার সময় অভিযুক্তরা প্রকাশ্যে হুমকি দিয়ে যায়, দাবিকৃত ৫ লাখ টাকা না দিলে এবং লিগ্যাল এইডের আবেদন প্রত্যাহার না করলে নুরজাহান ও তার বাবাকে যেখানেই পাওয়া যাবে, সেখানেই ১০০% নিশ্চিতভাবে খুন করে লাশ গুম করে ফেলা হবে। পরবর্তীতে অচেতন অবস্থায় স্বজনেরা নুরজাহানকে উদ্ধার করে আবারও বীরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে ভর্তি করান। গুরুতর আঘাত নিয়ে তিনি বর্তমানে হাসপাতালের বিছানায় যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন।

এই মর্মান্তিক ঘটনায় গৃহবধূর বাবা মো. রুহুল আমিন বাদী হয়ে জামাই মো. রাশেদ ইসলাম, মো. খিজির আলী, মো. রাবিউল ইসলাম ও মো. রিয়াজুল ইসলামসহ অজ্ঞাতপরিচয় আরও ২–৩ জনের বিরুদ্ধে বীরগঞ্জ থানায় হত্যাচেষ্টার মামলা করেছেন। তবে আনীত অভিযোগের ব্যাপারে স্বামী মো. রাশেদ ইসলামের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কোনো কথা বলতে রাজি হননি। বীরগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. সাইফুল ইসলাম জানিয়েছেন, ঘটনাটি পুলিশ অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে তদন্ত করছে এবং জড়িতদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা হবে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ