গুলিস্তানে জাসদ কার্যালয়ে পুলিশের অভিযান: আটক ২৮৯, যাচাই শেষে মুক্তির আশ্বাস

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

রাজধানীর গুলিস্তানে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে শনিবার এক ঝটিকা অভিযান চালায় পুলিশ। শনিবার বেলা তিনটার দিকে শুরু হওয়া এই অভিযানে দলটির কেন্দ্রীয় প্রতিনিধি সভা থেকে সাংবাদিক নেতাসহ মোট ২৮৯ জনকে আটক করে থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। অভিযানের পর রাতে পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আটক ব্যক্তিদের মধ্যে যারা জাসদের মূল নেতা-কর্মী, যাচাই-বাছাই শেষে পুলিশ তাদের ছেড়ে দেবে। তবে এই রাজনৈতিক কার্যালয়ে অন্য কোনো নিষিদ্ধ বা চিহ্নিত অপরাধী রয়েছে কি না, তা নিখুঁতভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। হঠাৎ এই বড় অভিযানে গুলিস্তান ও পল্টন এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়।

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মতিঝিল অঞ্চলের সহকারী কমিশনার (এসি) সাকিবুল আলম ভূঁইয়া শনিবার রাত ১১টার দিকে বিষয়টি সাংবাদিকদের কাছে নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, পুলিশের কাছে সুনির্দিষ্ট গোপন তথ্য ছিল যে জাসদ কার্যালয়ে আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মীরা জড়ো হয়েছেন। এমনকি কার্যালয়ের ভেতর থেকে সরকারবিরোধী ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেওয়ার খবরও পায় পুলিশ। এই তথ্যের ভিত্তিতেই পুলিশ দ্রুত পুরো ভবনটি ঘিরে ফেলে তল্লাশি চালায়। সেখান থেকে উপস্থিত সবাইকে হেফাজতে নেওয়া হয়। আটক হওয়া ২৮৯ জনকে পল্টন, শাহজাহানপুরসহ আশেপাশের কয়েকটি থানায় নিয়ে নিবিড়ভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। যাদের বিরুদ্ধে কোনো অপরাধ নেই, তাদের দ্রুত ছেড়ে দেওয়া হবে।

পুলিশের এই দাবিকে পুরোপুরি নাকচ করে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছে জাসদ নেতৃত্ব। দলটির কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে পাঠানো এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে বলা হয়, শনিবারের কেন্দ্রীয় প্রতিনিধি সভাটি ছিল তাদের একটি পূর্বনির্ধারিত দলীয় সাংগঠনিক কার্যক্রম। জাসদ নেতারা দাবি করেন, কোনো রাখঢাক না রেখে নিয়ম অনুযায়ী ডিএমপির পুলিশ কমিশনার, মতিঝিল জোনের ডিসি এবং পল্টন থানার ওসিকে আগেই লিখিতভাবে অবহিত করেই তারা এই সভার আয়োজন করেছিলেন। জাসদ দেশে কোনো নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দল নয় এবং তাদের স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক কর্মসূচিতে কোনো প্রশাসনিক নিষেধাজ্ঞাও নেই। তাই পুলিশি অভিযানকে তারা সম্পূর্ণ অনাকাঙ্ক্ষিত ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে আখ্যা দিয়েছে।

বিবৃতিতে জাসদ আরও অভিযোগ করেছে, তাদের এই প্রতিনিধি সভায় সারা দেশ থেকে আসা প্রায় ৫০০ জন নেতা-কর্মী উপস্থিত ছিলেন। উপস্থিত নেতাকর্মীদের মধ্যে অন্তত ৩০ জন ছিলেন নারী কর্মী। জাসদের ভাষ্য অনুযায়ী, সভা চলাকালীন যুবদলের প্রায় ৫০০ কর্মী পুলিশের চোখের সামনেই লাঠিসোঁটা নিয়ে কার্যালয়ে জোরপূর্বক ঢুকে তাণ্ডব চালায়। তারা সেখানে উপস্থিত জাসদ নেতা-কর্মীদের ওপর নির্বিচারে চড়াও হয় এবং শারীরিকভাবে রক্তাক্ত করে। অথচ হামলাকারীদের না ধরে পুলিশ উল্টো জাসদ নেতাদের কার্যালয় থেকে আটক করে নিয়ে যায়। জাসদের নিজস্ব সভার আড়ালে আওয়ামী লীগের লোকজন থাকার খবরটিকে তারা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বিভ্রান্তি বলে দাবি করেছে।

এই অভিযান চলাকালে ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের (ডিইউজে) সাবেক সভাপতি আবু জাফর সূর্যকেও পুলিশ আটক করেছে। তিনি কেন সেখানে গিয়েছিলেন এ বিষয়ে জাসদের দপ্তর সম্পাদক সাজ্জাদ হোসেন জানান, আবু জাফর সূর্য ব্যক্তিগতভাবে জাসদের রাজনীতির কট্টর সমর্থক। সে কারণেই তিনি দলীয় এই সভায় শুভানুধ্যায়ী হিসেবে উপস্থিত হয়েছিলেন। এদিকে গুলিস্তানের মতো ব্যস্ততম বাণিজ্যকেন্দ্রে এমন বড় আকারের অভিযানের কারণে আশেপাশের ফুটপাত ও মার্কেটের কেনাবেচা প্রায় ৬০% থেকে ৭০% কমে যায়। স্থানীয় দোকানদারদের দাবি, হঠাৎ এই আতঙ্কে আশপাশের মার্কেটগুলো বন্ধ রাখতে বাধ্য হওয়ায় কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে প্রায় $১০,০০০ ডলার সমমূল্যের বাণিজ্যিক ক্ষতি হয়েছে।

অভিযান শেষে মতিঝিল জোনের পুলিশ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কোনো নিরপরাধ বা রাজনৈতিক কর্মীকে অহেতুক হয়রানি করা প্রশাসনের উদ্দেশ্য নয়। তারা আটক প্রত্যেকের জাতীয় পরিচয়পত্র এবং স্থানীয় দলীয় পরিচয় শতভাগ অর্থাৎ ১০০% নিশ্চিত করে মুক্ত করে দিচ্ছেন। রাজনৈতিক অঙ্গনে কোনো অপশক্তি যেন ছদ্মবেশে আশ্রয় নিয়ে বিশৃঙ্খলা তৈরি করতে না পারে, সেজন্য পুলিশ বাড়তি সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। যাচাই-বাছাইয়ের কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত পল্টন ও আশপাশের এলাকার নিরাপত্তা জোরদার রাখা হয়েছে।

গুলিস্তানের জাসদ কার্যালয়ের সামনে এখনও থমথমে পরিবেশ বিরাজ করছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে কার্যালয়ের মূল প্রবেশপথে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রাখা হয়েছে। পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, যাদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সন্দেহজনক মনে হবে না, রবিবার সকালের মধ্যেই তাদের পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে। তবে যাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট মামলা রয়েছে, তাদের বিজ্ঞ আদালতে পাঠানো হবে। এ ঘটনায় জাতীয় রাজনীতিতে নতুন করে আলোচনা-সমালোচনার ঝড় উঠেছে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ