বিগত ১৭ বছরে যারা দেশে গুম, খুন, গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী জঘন্য অপরাধ চালিয়েছে, সেই আওয়ামী ফ্যাসিবাদী শক্তিকে এ দেশের মাটিতে আর কখনো রাজনীতি করতে দেওয়া হবে না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। শনিবার বিকেলে রাজধানীর ধোলাইখালের সাদেক হোসেন খোকা মাঠে আয়োজিত এক বিশাল গণসমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এই হুঁশিয়ারি দেন। সমাবেশে যোগ দিতে দুপুর থেকেই রাজধানীর বিভিন্ন ওয়ার্ড থেকে মিছিল নিয়ে দলে দলে নেতা-কর্মীরা মাঠে এসে জড়ো হন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার ইশরাক হোসেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, রক্তক্ষয়ী ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশে নতুন করে কোনো স্বৈরাচার কিংবা ফ্যাসিবাদের ঠাঁই হবে না।
তিনি দৃঢ়তার সাথে ঘোষণা করেন, বিগত সরকারের সংঘটিত প্রতিটি গণহত্যার বিচার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে নিশ্চিত করা হবে। বিচারকাজ দ্রুত শেষ করতে প্রয়োজনে ট্রাইব্যুনালের সংখ্যা বাড়ানো হবে। ভারতে পালিয়ে থাকা শেখ হাসিনার দলীয় ভার্চ্যুয়াল বৈঠক ও ডিসেম্বরে প্রত্যাবর্তনের ঘোষণা নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, শেখ হাসিনা মানবতাবিরোধী অপরাধে সাজাপ্রাপ্ত ও ফাঁসির দণ্ডাদেশ পাওয়া পলাতক আসামি। ভারত-বাংলাদেশ প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুযায়ী পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে তাঁকে ফেরত চাওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, ভারত সরকারকে আমরা আহ্বান জানাই, সাজাপ্রাপ্ত আসামিকে দ্রুত হস্তান্তর করুন। আমরা শতভাগ আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে বিচার করছি। তিনি দেশে ফিরলে আপিলের সুযোগ পাবেন, তবে সাজা বা বিচার এড়ানোর কোনো সুযোগ কারো নেই।
দলের নেতা-কর্মীদের মনমানসিকতা ও রাজনৈতিক সংস্কৃতি পরিবর্তনের তাগিদ দিয়ে বিএনপির এই স্থায়ী কমিটির সদস্য বলেন, কোনো ব্যক্তির নামে স্লোগান দেওয়া আমাদের আদর্শিক সংস্কৃতি হতে পারে না। এই ধরনের ব্যক্তিকেন্দ্রিক স্লোগান পরিহার করতে হবে। সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, গণ-অভ্যুত্থান আমাদের অনেক কিছু শিখিয়েছে। এখন থেকে প্রতিটি স্লোগান হবে রাজনৈতিক, যা ফ্যাসিবাদবিরোধী লড়াই এবং বীর শহীদদের রক্তকে মর্যাদা দেওয়ার কথা বলবে। তিনি বলেন, দলের ত্যাগী কর্মীদের মূল্যায়ন হবে তাদের কাজের মাধ্যমে, ব্যক্তির স্তাবকতা করে নয়। দল পরিচালনায় ব্যক্তির চেয়ে নীতি ও জনগণের স্বার্থকে প্রাধান্য দিতে হবে।
বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের গত ৭ মাসের কাজের সাফল্য তুলে ধরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বিপুল জন-আকাঙ্ক্ষা নিয়ে এই সরকার কাজ শুরু করেছে। সরকার যখন আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, সাংবিধানিক সংস্কার এবং গণতন্ত্র সুসংহত করতে দিনরাত কাজ করছে, তখন একটি রাজনৈতিক গোষ্ঠী মাত্র ৭ মাসের মাথায় সরকার পতনের এক দফা ও লংমার্চের হুংকার দিচ্ছে। বিরোধীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, আপনাদের সংবিধান সংশোধন কমিটিতে অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। অথচ আপনারা সেই সুযোগ ছেড়ে মাঠে নেমেছেন। উত্তরের লংমার্চ শেষ করে দক্ষিণে যাচ্ছেন, আবার পূর্ব-পশ্চিমে যাবেন। দেশের মানুষ আপনাদের এই চাতুর্য ধরে ফেলেছে। চার বছর পর আন্দোলনের যুক্তি থাকলেও ৭ মাসের মাথায় এই তৎপরতা ভিত্তিহীন।
জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি প্রসঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারের চিত্র তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম অস্বাভাবিক বেড়ে গিয়ে বর্তমানে ব্যারেলপ্রতি প্রায় $৮৫ থেকে $৯০ ডলারে ঠেকেছে। এতে প্রতিবেশী দেশগুলোতেও তেলের দাম প্রায় ২০% থেকে ২৫% বৃদ্ধি পেয়েছে। জনগণের দুর্ভোগের কথা বিবেচনা করে সরকার প্রথম এক মাস ১ টাকাও তেলের দাম বাড়ায়নি। তবে সীমান্ত দিয়ে শত শত কোটি টাকার তেল পাচার রোধ এবং বিশ্ববাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে সর্বনিম্ন পরিমাণ মূল্য সমন্বয় করতে হয়েছে। সাময়িক এই কষ্টের জন্য দুঃখ প্রকাশ করে তিনি আশ্বস্ত করেন, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ৫% থেকে ১০% কমামাত্রই আনুপাতিক হারে বাংলাদেশেও তেলের দাম কমিয়ে আনা হবে।
সমাবেশের শেষভাগে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ দেশবাসীকে ফ্যাসিবাদের যেকোনো চক্রান্তের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, এ দেশের ছাত্র-জনতা রাজপথে বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়ে ফ্যাসিবাদের পতন নিশ্চিত করেছে। শতভাগ নিষ্ঠার সাথে সেই ত্যাগের মর্যাদা রক্ষা করতে হবে এবং দেশে একটি স্থিতিশীল গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সবাইকে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই চালিয়ে যেতে হবে। তিনি আরও স্মরণ করিয়ে দেন, আন্দোলনের মাধ্যমে অর্জিত জনআকাঙ্ক্ষাকে ব্যর্থ হতে দেওয়া যাবে না। কোনো অশুভ শক্তি যেন বিভেদ তৈরি করতে না পারে, সে জন্য দেশবাসীকে সর্বদা সতর্ক থাকতে হবে।
















