চুয়াডাঙ্গার জীবননগর উপজেলায় কৃত্রিম সংকট তৈরি করে কৃষকদের জিম্মি করার অপচেষ্টা নস্যাৎ করে দিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। পরপর দুই দিন উপজেলার বিভিন্ন বাজারে সাঁড়াশি অভিযান চালিয়ে অবৈধভাবে মজুত করে রাখা ৭২৩ বস্তা সরকারি রাসায়নিক সার জব্দ করেছে ভ্রাম্যমাণ আদালত ও পুলিশ। শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) অভিযান শেষে সন্ধ্যায় এই তথ্য নিশ্চিত করে প্রশাসন। এই ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে দুই অসাধু ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে বিশেষ ক্ষমতা আইনে পৃথক দুটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। একই সঙ্গে অপরাধীদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো সিলগালা করে দিয়েছে প্রশাসন। হঠাৎ এই ঝটিকা অভিযানের পর থেকে উপজেলার অন্যান্য অসাধু সার কারবারিদের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, বোরো ও রবি মৌসুমকে সামনে রেখে কতিপয় অসাধু ব্যবসায়ী লাইসেন্স ছাড়াই বিপুল পরিমাণ সার মজুত করে দাম বাড়ানোর পাঁয়তারা করছিল। এমন তথ্যের ভিত্তিতে জীবননগর পৌর শহরের দত্তনগর সড়কে অবস্থিত ‘শান্তনা এন্টারপ্রাইজ’ নামক দোকানে প্রথম অভিযান চালান জীবননগর উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) সুমাইয়া সুলতানা এ্যানি। সেখানে কোনো বৈধ কাগজপত্র ও লাইসেন্স ছাড়াই মজুত করা ৪০৩ বস্তা ডিএপি সার হাতেনাতে জব্দ করা হয়। তবে অভিযানের বিষয়টি আগেভাগে টের পেয়ে দোকানের মালিক আবুল কালাম আজাদ সটকে পড়েন। প্রশাসন তাৎক্ষণিকভাবে দোকানটি সিলগালা করে দেয়।
এদিকে দ্বিতীয় দফায় হাসাদাহ বাজারে আরেক বড় ধরনের অভিযান চালায় পুলিশ প্রশাসন। জীবননগর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) সোলায়মান শেখের নেতৃত্বে পুলিশের একটি দল হাসাদাহ বাজারের ‘তৌফিক এন্টারপ্রাইজ’ নামের প্রতিষ্ঠানে হানা দেয়। এ সময় প্রতিষ্ঠানটির মালিক আব্দুল খালেকের উপস্থিতিতেই ৩২০ বস্তা ডিএপি, টিএসপি ও এমওপি সার উদ্ধার করে পুলিশ। বৈধ ছাড়পত্র ও সরকারি অনুমোদন না থাকায় ঘটনাস্থলেই তৌফিক এন্টারপ্রাইজের তিনটি দোকান সিলগালা করে দেওয়া হয়। দুই অভিযানে সব মিলিয়ে মোট ৭২৩ বস্তা সরকারি রাসায়নিক সার জব্দ করা সম্ভব হয়েছে।
কৃষি সংশ্লিষ্টরা জানান, জব্দ করা এই বিপুল পরিমাণ সারের আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকা, যা বৈশ্বিক মুদ্রায় প্রায় $১৬,০০০ ডলারের সমান। অসাধু মজুতদাররা মাঠপর্যায়ে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে কৃষকদের কাছে প্রতি বস্তা সারে অন্তত ২০% থেকে ৩০% পর্যন্ত বাড়তি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছিল। সরকার নির্ধারিত দামের তোয়াক্কা না করে ১০০% অতিরিক্ত মুনাফার আশায় এসব সার লুকিয়ে রাখা হয়েছিল। এই চক্রের কারণে সাধারণ কৃষকরা চরম আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছিলেন এবং বাধ্য হয়ে চড়া দামে সার সংগ্রহ করছিলেন।
অভিযানের বিষয়ে জীবননগর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) সোলায়মান শেখ স্পষ্ট করে জানান, সরকারি নির্দেশনা অমান্য করে অবৈধভাবে সার মজুত ও চড়া দামে বিক্রির অপরাধে ব্যবসায়ী আবুল কালাম আজাদ ও আব্দুল খালেকের বিরুদ্ধে থানায় বিশেষ ক্ষমতা আইনে দুটি নিয়মিত মামলা রুজু হয়েছে। তিনি বলেন, পুলিশ পলাতক আসামি আবুল কালাম আজাদকে গ্রেফতারে জোর তৎপরতা চালাচ্ছে। অপরাধী যত প্রভাবশালীই হোক না কেন, তাকে আইনের আওতায় আসতেই হবে। কৃষকদের স্বার্থে থানা পুলিশ দিন-রাত সার্বক্ষণিক সতর্ক পাহারায় রয়েছে। নিয়মিত বাজার তদারকির মাধ্যমে অপরাধীদের আইনের মুখোমুখি করা হবে।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) সুমাইয়া সুলতানা এ্যানি বলেন, প্রান্তিক কৃষকদের ন্যায্যমূল্যে সার সরবরাহ নিশ্চিত করতে প্রশাসন জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে। কোনো ব্যবসায়ী বা ডিলার কৃত্রিম সংকট তৈরি করে কৃষকদের ঠকাতে পারবে না। অনুমোদন ছাড়া বা কালোবাজারে সার বিক্রি করলে কাউকে বিন্দুমাত্র ছাড় দেওয়া হবে না। আমরা অত্যন্ত কঠোর হাতে এই অপতৎপরতা দমন করব। বাজার পুরোপুরি স্বাভাবিক ও ১০০% সিন্ডিকেটমুক্ত না হওয়া পর্যন্ত আমাদের এই ঝটিকা অভিযান নিয়মিতভাবে চলমান থাকবে।
প্রশাসনের এমন সাহসী পদক্ষেপে জীবননগর উপজেলার প্রান্তিক চাষিদের মুখে হাসি ফুটেছে এবং স্বস্তি ফিরে এসেছে। স্থানীয় কৃষকরা জানান, চাষাবাদের ভরা মৌসুমে সার না পেয়ে তাদের চরম বিপাকে পড়তে হতো। ডিলার ও মজুতদাররা কৃত্রিম অভাব দেখিয়ে সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে ২৫% থেকে ৩৫% বেশি দাম হাঁকাত। এখন উপজেলা প্রশাসন ও পুলিশের কঠোর পদক্ষেপে কৃষকরা আশার আলো দেখছেন। সাধারণ চাষি ও এলাকার সচেতন মহলের দাবি, জীবননগরকে পুরোপুরি সার সিন্ডিকেটমুক্ত রাখতে এই ধরণের তদারকি ও নজরদারি যেন বছরজুড়ে অব্যাহত থাকে।
















