হুতি হামলা মোকাবিলায় সৌদি আরবের পাশে মিত্ররা: ‘মক্কা চুক্তি’ বাস্তবায়নে তিন সেনাপ্রধানের বৈঠক, ইয়ানবুতে সেনা পাঠাবে ফ্রান্স

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের ধারাবাহিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার মুখে নিজেদের প্রতিরক্ষা জোরদার করতে বড় ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে সৌদি আরব। লোহিত সাগর উপকূলের গুরুত্বপূর্ণ শহর জেদ্দা, পবিত্র মক্কা ও প্রধান তেল বন্দর ইয়ানবুতে হুতিরা ব্যাপক আক্রমণ চালানোর পর এই সংকট গভীর হয়েছে। যদিও সৌদি আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা হুতিদের ছোড়া অন্তত ৬টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র আকাশে ধ্বংস করেছে, তবুও জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে পুরো মধ্যপ্রাচ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। সৌদি আরবের আকাশে একের পর এক বিস্ফোরণের শব্দে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যেও চরম ভীতি ছড়িয়ে পড়ে। এমন পরিস্থিতিতে রিয়াদকে সামরিক নিরাপত্তা দিতে এক ছাতার নিচে আসছে তুরস্ক ও পাকিস্তান।

উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’র রূপরেখা চূড়ান্ত করতে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের সেনাপ্রধানেরা এক জরুরি বৈঠকে বসছেন। এর আগে ইয়েমেন থেকে হুতিদের পুরোপুরি নির্মূল না করা পর্যন্ত জীবন বাজি রেখে লড়ার আহ্বান জানান সৌদি আরবের শীর্ষ ধর্মীয় কর্তৃপক্ষ গ্র্যান্ড মুফতি। মাঠপর্যায়ের কৌশল নির্ধারণে শুক্রবার সৌদি আরবে পৌঁছান তুরস্কের সেনাপ্রধান জেনারেল সেলসুক বায়রাকতারোগলু। ন্যাটোর ধারা ৫-এর আদলে তৈরি এই ঐতিহাসিক চুক্তির মূল কথা হলো—মিত্র তিন দেশের যেকোনো একজনের ওপর হামলা হলে তা সবার ওপর আক্রমণ বলে গণ্য হবে।

তুরস্কের পার্লামেন্ট স্পিকার নুমান কুরতুলমুশ শুক্রবার আঙ্কারায় সাংবাদিকদের জানান, চুক্তিটি আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকরের জন্য আগামী অক্টোবরের অধিবেশনে পার্লামেন্টে তোলা হবে। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, এই সামরিক বোঝাপড়া কোনোভাবেই ইরানের বিরুদ্ধে নয়, বরং ইসরায়েলের আগ্রাসী নীতি ও আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা থেকে মুসলিম বিশ্বকে রক্ষা করাই এর প্রধান লক্ষ্য। এমনকি ভবিষ্যতে ইরানসহ মধ্যপ্রাচ্যের অন্য দেশগুলোও এই জোটে শরিক হতে পারে বলে তিনি ইঙ্গিত দেন। চুক্তিটি পূর্ণ অনুমোদন পেলে মুসলিম দেশগুলোর সমন্বয়ে এটি এক বিশাল প্রতিরক্ষা বলয় তৈরি করবে।

এদিকে সৌদি আরবের প্রধান তেল রপ্তানি কেন্দ্র ইয়ানবু বন্দর রক্ষায় ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ সেনা, আধুনিক রাডার ও উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা পাঠানোর বড় ঘোষণা দিয়েছেন। এক বিশেষ টিভি সাক্ষাৎকারে তিনি নিশ্চিত করেন, ফরাসি বাহিনীর এই উপস্থিতির অর্থ সরাসরি কোনো যুদ্ধে জড়ানো নয়, বরং আন্তর্জাতিক তেলের বাজার স্থিতিশীল রাখা। বিশ্বের প্রায় ২০% থেকে ২৫% জ্বালানি সরবরাহ এই অঞ্চলের ওপর নির্ভরশীল। তাই এই তেলের বন্দরে কোনো বড় আঘাত এলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম প্রতি ব্যারেলে ১০০ $ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আন্তর্জাতিক অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করছেন।

গত ফেব্রুয়ারি মাস থেকে পারস্য উপসাগরের কৌশলগত হরমুজ প্রণালি কার্যত অচল থাকায় সৌদি আরবের তেল রপ্তানি এখন প্রায় শতভাগ ইয়ানবু বন্দরের ওপর নির্ভরশীল। হুতিরা এই বন্দরে ক্রমাগত ড্রোন হামলার চেষ্টা করায় বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। সংকট মোকাবিলায় ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইউরোপে পর্যাপ্ত জ্বালানি তেলের মজুত রাখার নিশ্চয়তা দেন। একই সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ডিজেল রপ্তানি নিষিদ্ধ করলে বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের মহাবিপর্যয় নেমে আসবে বলেও সতর্ক করেন তিনি, যদিও হোয়াইট হাউস তাৎক্ষণিকভাবে এমন আশঙ্কার কথা উড়িয়ে দিয়েছে।

উত্তেজনার মধ্যেই নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশনের ফাঁকে কাতার সরকারের মধ্যস্থতায় ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে পর্দার আড়ালে আলোচনা চলছে। এই কূটনৈতিক তৎপরতার মধ্যেই ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এক সাক্ষাৎকারে হুতিদের সাম্প্রতিক হামলা থেকে দূরত্ব বজায় রেখে জানান, হুতিরা সম্পূর্ণ নিজেদের সিদ্ধান্তে এসব আক্রমণ চালাচ্ছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তেলের দাম স্থিতিশীল থাকলে মুদ্রাস্ফীতির চাপ অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে থাকবে। তেহরানের সঙ্গে নতুন করে আলোচনার ইঙ্গিত মিলতেই বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম প্রায় ৩% কমে এসেছে, যা কিছুটা হলেও সাধারণ ক্রেতাদের স্বস্তি জুগিয়েছে।

তবে আলোচনার পাশাপাশি কঠোর নিষেধাজ্ঞার খাঁড়াও ঝুলিয়ে রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটন সম্প্রতি ইরানের সঙ্গে জড়িত তৃতীয় পক্ষের ওপর সেকেন্ডারি স্যাংশন জারি করেছে। এর সরাসরি প্রভাবে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ওমান তাদের আকাশসীমায় ইরানি সব ধরনের বিমান চলাচল পুরোপুরি নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে একদিকে সামরিক যুদ্ধের প্রস্তুতি আর অন্যদিকে পর্দার পেছনের কূটনীতি এক চরম অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে, যার প্রভাব পড়ছে পুরো বিশ্বের জ্বালানি বাজারে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ