জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে অংশ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে অত্যন্ত ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বিভিন্ন দেশের সরকারপ্রধান ও বিশ্বনেতাদের সঙ্গে ধারাবাহিক দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করে তিনি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কূটনীতিকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাচ্ছেন। সফরের অংশ হিসেবে গতকাল শুক্রবার সকালে নিউইয়র্কে কুয়েতের স্থায়ী মিশনে দেশটির ক্রাউন প্রিন্স শেখ সাবাহ খালেদ আল-হামাদ আল-সাবাহর সঙ্গে এক ফলপ্রসূ বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী। বৈঠকে দুই বন্ধুপ্রতিম মুসলিম দেশের মধ্যকার ঐতিহাসিক সম্পর্ককে বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্তে নিয়ে যাওয়ার বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন দুই নেতা।
কুয়েতের ক্রাউন প্রিন্সের সঙ্গে আলাপকালে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সময় গড়ে ওঠা ঐতিহাসিক সম্পর্কের কথা স্মরণ করেন। তিনি বলেন, সেই পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও আস্থার ভিত বর্তমানে আরও সুদৃঢ় হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের এ দেশটিতে বর্তমানে কয়েক লাখ বাংলাদেশি কর্মী কাজ করছেন, যা থেকে প্রতি বছর শত শত কোটি $ ডলারের রেমিট্যান্স বাংলাদেশে আসে। প্রধানমন্ত্রী কুয়েতে আরও বেশি দক্ষ পেশাজীবী ও কারিগরি জনশক্তি নেওয়ার জন্য ক্রাউন প্রিন্সকে বিশেষ অনুরোধ জানান। একই সাথে দুই দেশের আমদানি-রপ্তানি বাড়াতে যৌথ অর্থনৈতিক কমিশন দ্রুত সক্রিয় করার ওপর তিনি জোর দেন।
শুধু মধ্যপ্রাচ্যই নয়, ইউরোপের উদীয়মান অর্থনীতির সঙ্গেও সংযোগ বাড়াতে জোরালো উদ্যোগ নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রীর সহকারী প্রেস সচিব একেএম নাজমুল হক জানান, এর আগে গত ২৩ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সদর দপ্তরে ক্রোয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আন্দ্রেই প্লেনকোভিচের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক বৈঠক করেন তারেক রহমান। বৈঠকে ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশি তৈরি পোশাক, ওষুধ ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতের রপ্তানি বৃদ্ধি এবং কৃষি ও আধুনিক শিল্পে দক্ষ কর্মী পাঠানোর বিষয়ে দুই নেতা একমত হন। এছাড়া আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ফোরামে দুই দেশের অভিন্ন স্বার্থ রক্ষায় জাতিসংঘে একসঙ্গে কাজ করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন ক্রোয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী।
আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদারের অংশ হিসেবে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশী থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী আনুতিন চার্নভিরাকুলের সঙ্গেও দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ২৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ বিতর্কে থাই প্রধানমন্ত্রীর পরই ভাষণ দেন তারেক রহমান। ওই বৈঠকে আঞ্চলিক নিরাপত্তা, সমুদ্রপথের বাণিজ্যিক যোগাযোগ বাড়ানো এবং দুই দেশের মধ্যকার বাণিজ্যঘাটতি অন্তত ২০% থেকে ৩০% কমিয়ে আনার বাস্তবসম্মত কৌশল নিয়ে আলোচনা করেন দুই নেতা। উভয় নেতা মনে করেন, আসিয়ান জোটের সঙ্গে বাংলাদেশের সরাসরি অর্থনৈতিক সংযোগ জোরদার করতে থাইল্যান্ড একটি কার্যকর ও নির্ভরযোগ্য সেতু হিসেবে ভূমিকা রাখতে পারে।
স্বাস্থ্য ও মানবসম্পদ উন্নয়ন নিশ্চিত করতে জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের (ইউএনএফপিএ) উচ্চপর্যায়ের একটি যৌথ অনুষ্ঠানেও অংশ নেন তারেক রহমান। সেখানে সুইডেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মারিয়া মালমের স্টেনারগার্ডের সঙ্গে এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক করেন তিনি। সুইডেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনায় বাংলাদেশে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় পেশাদার মিডওয়াইফারি বা ধাত্রীবিদ্যার প্রসারের ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব দেন তিনি। মা ও নবজাতকের অকাল মৃত্যুর হার শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে এবং দেশের স্বাস্থ্য খাতে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়াতে সুইডেন আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা অব্যাহত রাখার প্রত্যয় পুনর্ব্যক্ত করেছে।
প্রধানমন্ত্রীর সহকারী প্রেস সচিব একেএম নাজমুল হক সাংবাদিকদের জানান, নিউইয়র্কে সরকারপ্রধানের প্রতিটি দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের মূল উদ্দেশ্যই ছিল অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব তৈরি ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান বৃদ্ধি। বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য নতুন বাজার ও বিনিয়োগ অন্বেষণ করা অত্যন্ত জরুরি। সে লক্ষ্যেই প্রধানমন্ত্রী বহির্বিশ্বের সঙ্গে বাংলাদেশের শতভাগ তথা ১০০% আস্থার সম্পর্ক পুনর্গঠনে জোর দিচ্ছেন। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের স্বার্থরক্ষা ও বৈধ চ্যানেলে রেমিট্যান্স পাঠানো নিশ্চিত করার তাগিদও তিনি তুলে ধরেন।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ফাঁকে প্রধানমন্ত্রীর এই বহুমাত্রিক কূটনৈতিক প্রচেষ্টা বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তিকে আরও উজ্জ্বল করেছে। মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বন্ধুরাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে শীর্ষ পর্যায়ের সরাসরি সংলাপ বাংলাদেশে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগের নতুন দুয়ার খুলে দেবে বলে সবাই আশাবাদী। অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে শক্তিশালী অবস্থান ধরে রাখতে বাংলাদেশ আগামীতেও বিশ্বনেতাদের সঙ্গে পারস্পরিক শ্রদ্ধাপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখে সামনে এগিয়ে যাবে।
















