গোয়াইনঘাট সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে বাংলাদেশি যুবক আহত: উল্টো বিজিবির ওপর হামলা, মামলা দায়ের

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার নলজুড়ি সীমান্ত এলাকায় ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) গুলিতে মো. বাবলা লিটন (২৮) নামের এক বাংলাদেশি যুবক আহত হয়েছেন। মঙ্গলবার ভোরে সীমান্তের শূন্যরেখায় এই ঘটনা ঘটলেও বুধবার রাতে বিষয়টি স্থানীয়দের মধ্যে জানাজানি হয়। গুলিটি বাবলা লিটনের হাতে লেগেছে বলে জানা গেছে। তবে আহত হওয়ার ঘটনার পরপরই বিজিবি সদস্যদের ওপর উল্টো হামলা ও সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগে লিটনসহ ৮ থেকে ৯ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)।

মামলার এজাহার ও স্থানীয় সূত্র জানায়, মঙ্গলবার ভোররাতে গোয়াইনঘাটের নলজুড়ি সীমান্তের আন্তর্জাতিক সীমান্ত পিলার ১২৭৮/৪-সংলগ্ন এলাকা দিয়ে বাবলা লিটনের নেতৃত্বে ৭ থেকে ৮ জনের একটি দল ভারতে অবৈধভাবে প্রবেশের চেষ্টা করে। এ সময় ভারতীয় সীমান্তের ভেতরে টহলে থাকা বিএসএফ সদস্যরা তাদের দেখতে পেয়ে দ্রুত ধাওয়া দেন। তখন অনুপ্রবেশকারীরা পিছু হটার বদলে বিএসএফ সদস্যদের লক্ষ্য করে বৃষ্টির মতো ইট ও পাথর ছুড়তে শুরু করে। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে বিএসএফ সদস্যরা চার রাউন্ড গুলি ছোড়েন। এতে একটি গুলি বাবলা লিটনের হাতে বিদ্ধ হয়।

গুলিবিদ্ধ হওয়ার পরও বাবলা লিটন ও তাঁর সহযোগীরা সীমান্ত এলাকা ছেড়ে না গিয়ে সেখানে অবস্থান করে বিএসএফকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ অব্যাহত রাখেন। এই গোলযোগের খবর পেয়ে সিলেট ব্যাটালিয়নের (৪৮ বিজিবি) আওতাধীন তামাবিল বিওপির একটি টহল দল দ্রুত ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়। কিন্তু চোরাকারবারি দলটি বিজিবি সদস্যদের দেখে আরও ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। তারা কর্তব্যরত বিজিবি সদস্যদের লক্ষ্য করেও এলোপাতাড়ি পাথর ও ইট ছুড়তে থাকে। এতে কয়েকজন বিজিবি সদস্য শরীরে আঘাত পেয়ে সামান্য জখম হন।

বিজিবি সূত্রে জানা যায়, নিজেদের আত্মরক্ষা এবং উশৃঙ্খল দলটিকে ছত্রভঙ্গ করতে বিজিবি সদস্যরা ঘটনাস্থলে সতর্কতামূলকভাবে ৫ রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছোড়েন। গুলির শব্দে পরিস্থিতি প্রতিকূল বুঝতে পেরে বাবলা লিটন ও তাঁর সহযোগীরা সীমান্তবর্তী অন্ধকার পথ ধরে দ্রুত পালিয়ে যান। স্থানীয়দের ধারণা, আহত বাবলা লিটন গ্রেপ্তার এড়াতে কোনো গোপন ক্লিনিকে চিকিৎসা নিচ্ছেন। সরকারি দায়িত্ব পালনে সরাসরি বাধা এবং বিজিবি সদস্যদের ওপর আঘাতের ঘটনায় মঙ্গলবার রাতেই তামাবিল ক্যাম্প কমান্ডার মোহাম্মদ গোলাম মোস্তফা বাদী হয়ে গোয়াইনঘাট থানায় একটি নিয়মিত মামলা দায়ের করেন।

ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে সিলেট ব্যাটালিয়ন (৪৮ বিজিবি)-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ নাজমুল হক জানান, সীমান্ত এলাকায় কোনো ধরনের অবৈধ অনুপ্রবেশ বা আইনবিরোধী কাজ বরদাশত করা হবে না। তিনি বলেন, চোরাকারবারিরা বিজিবি টহল দলকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ছুড়লে জওয়ানরা নিজেদের সুরক্ষায় তাৎক্ষণিক ৫টি ফাঁকা গুলি ছোড়েন। সীমান্তে শতভাগ নিরাপত্তা বজায় রাখতে বিজিবি সর্বদা প্রস্তুত রয়েছে। একই সঙ্গে তিনি স্পষ্ট করেন, সীমান্ত অপরাধীদের কোনো ছাড় দেওয়া হবে না এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়া চলমান থাকবে।

সীমান্তের স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, গোয়াইনঘাট ও তামাবিল সীমান্ত দিয়ে চোরাই পথে চিনি, চা-পাতা ও মহিষ পাচারের একটি সক্রিয় সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। এসব চোরাচালানে প্রায় ৫০% থেকে ৬০% অতিরিক্ত মুনাফা থাকায় কিছু বেকার যুবক রাতারাতি ধনী হওয়ার লোভে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ওপারে যায়। গোয়েন্দা তথ্যানুযায়ী, সীমান্তবর্তী এই পয়েন্টগুলোতে প্রতি মাসে গড়ে প্রায় $১০,০০০ থেকে $১৫,০০০ ডলারের সমপরিমাণ ভারতীয় পণ্য অবৈধভাবে দেশে আনার চেষ্টা চলে। আর এই চোরাচালানের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতেই দুর্বৃত্তরা দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর ওপর হামলা চালাতে দ্বিধা করে না।

গোয়াইনঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ওমর ফারুক মোড়ল সাংবাদিকদের বলেন, “বিজিবির ওপর হামলা ও সরকারি কাজে বাধার অভিযোগে মামলা রেকর্ড হয়েছে। মামলার প্রধান আসামি বাবলা লিটনসহ বাকি পলাতক আসামিদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করতে পুলিশ এলাকায় জোর সাঁড়াশি অভিযান শুরু করেছে। আশা করছি খুব দ্রুতই আসামিদের আইনের আওতায় নিয়ে আসা সম্ভব হবে।” ঘটনার পর থেকে নলজুড়ি সীমান্ত এলাকায় বিজিবির অতিরিক্ত টহল বাড়ানো হয়েছে এবং সেখানে 100% সতর্কতা জারি রাখা হয়েছে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ