অসুস্থ ছোট ভাইকে নিয়ে চট্টগ্রাম নগরের এনায়েতবাজারের বাসা থেকে বের হয়ে দ্রুত হাসপাতালের দিকে ছুটছিলেন মো. সাকিব আমান। গাড়িতে তাঁর সঙ্গে ছিলেন মা ও দুই ভাই। ঠিক দুপুর ১টা ০৬ মিনিটে হঠাৎ সাকিবের হোয়াটসঅ্যাপে একটি অডিও বার্তা আসে। বার্তাটি পাঠিয়েছিলেন তাঁর বাবা মো. আমান উল্লাহ, যিনি সুদূর ওমান সাগরে একটি বাণিজ্যিক জাহাজে প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। গাড়িতে বাজতে থাকা অডিওটি চালু করতেই বাবার কাঁপাকাঁপা গলা ভেসে আসে, “আব্বু, আব্বু, আমাদের জাহাজে মিসাইল অ্যাটাক হইছে। দোয়া করো আব্বু, দোয়া করো। হয়তো আর কমিউনিকেশন করতে পারব না, আব্বু। সাবধানে থাইকো। আর আম্মুকে এই কথা বলার দরকার নাই, আম্মু খুব চিন্তা করবে।”
গাড়ির সাউন্ড সিস্টেমে লাউডস্পিকার চালু থাকায় কথাগুলো সাকিবের মায়ের কানেও সরাসরি পৌঁছে যায়। বাবার কণ্ঠের চরম ভয় আর অসহায়ত্ব শুনে গাড়ির ভেতর মুহূর্তেই নেমে আসে পাথরচাপা স্তব্ধতা। কোনো সান্ত্বনাতেই আর মায়ের কান্না থামানো যাচ্ছিল না, তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন। ছোট ভাইয়ের চিকিৎসার জরুরি বিষয়টিও তখন এক নিমিষেই চাপা পড়ে যায়। বার্তাটি আসার পর দীর্ঘ কয়েক ঘণ্টা বাবার ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় চরম উৎকণ্ঠা ও আশঙ্কায় কাটে পরিবারের প্রতিটি সেকেন্ড। বাবার জীবন বাঁচাতে পরিবারের সদস্যরা তখন আল্লাহর দরবারে কায়মনোবাক্যে প্রার্থনা শুরু করেন।
পরবর্তী সময়ে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী জানা যায়, প্রধান প্রকৌশলী আমান উল্লাহ যে জাহাজে ছিলেন, তার নাম ‘এমভি কেপ দাও’। অ্যান্টিগুয়া ও বারবুডার পতাকাবাহী এই বাল্ক ক্যারিয়ারটি সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে পণ্য বোঝাই করে ভারতের একটি বন্দরের দিকে যাচ্ছিল। ওমানের মুসান্দাম উপকূল থেকে প্রায় ২৫ নটিক্যাল মাইল দূরে আন্তর্জাতিক সমুদ্রসীমায় জাহাজটি হঠাৎ ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন হামলার শিকার হয়। পর পর দুটি জোরালো বিস্ফোরণ জাহাজের পেছনের অংশে এসে আঘাত হানে। এতে ইঞ্জিনরুম এবং নাবিকদের থাকার আবাসন অংশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং সঙ্গে সঙ্গে দাউদাউ করে আগুন ধরে যায়।
এই হামলায় আমান উল্লাহর থাকার নিজস্ব কেবিনটি চুরমার হয়ে যায়। জাহাজের যে কক্ষে তিনি নিয়মিত বিশ্রাম নিতেন, সেই কেবিনটির দেয়াল ও ছাদ বিস্ফোরণের তীব্রতায় মুহূর্তেই ধসে পড়ে। তবে ভাগ্যের অসীম জোরে তিনি তখন কেবিনে উপস্থিত ছিলেন না। হামলার মুহূর্তে নিজের পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে তিনি অবস্থান করছিলেন জাহাজের সুরক্ষিত ইঞ্জিন নিয়ন্ত্রণকক্ষে। ঠিক এই কারণেই তিনি নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে অলৌকিকভাবে বেঁচে ফেরেন। হামলার পরপরই জাহাজের ইঞ্জিনকক্ষের প্রায় ৬০% এলাকা পুড়ে যায়। আন্তর্জাতিক শিপিং বিশ্লেষকদের মতে, পণ্যসহ জলযানটির ক্ষতির পরিমাণ বিশ্ববাজারে অন্তত $৫ থেকে $৮ মিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাবে।
হামলার খবর পেয়ে ওমানের রাজকীয় নৌবাহিনী বা রয়্যাল নেভি দ্রুত ওমান সাগরে উদ্ধার অভিযান শুরু করে। সাগরে টহলরত যুদ্ধজাহাজ ও সামরিক উদ্ধারকারী দল দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে এমভি কেপ দাও থেকে মোট ২৭ জন নাবিককে জীবিত উদ্ধার করে নিরাপদ উপকূলে নিয়ে আসে। তবে দুর্ভাগ্যজনকভাবে ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে এক নাবিক প্রাণ হারান। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নিশ্চিত করেছে যে আক্রান্ত জাহাজে মোট ২০ জন ভারতীয় নাবিক দায়িত্ব পালন করছিলেন। তাঁদের মধ্যে ১৯ জন অর্থাৎ প্রায় ৯৫% ক্রু অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার পেলেও সহকর্মীকে হারিয়ে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন অন্য নাবিকেরা।
সাকিব আমান নিজেও একজন নাবিক। তিনি বাংলাদেশ মেরিন একাডেমির ৫৩তম ব্যাচের প্রাক্তন ক্যাডেট এবং বর্তমানে দেশীয় শিপিং খাতে জুনিয়র মেরিন অফিসার হিসেবে নিয়োজিত। তাঁর বাবা আমান উল্লাহ দেশের মেরিন ফিশারিজ একাডেমির ১৫তম ব্যাচের এক অভিজ্ঞ সাবেক ক্যাডেট। সাকিব জানান, ওমানের নৌবাহিনী তাঁর বাবাসহ বেঁচে যাওয়া সব নাবিককে উপকূলে নিয়ে প্রাথমিক চিকিৎসা ও নিরাপদ আশ্রয় দেয়। রাতে বাবার সঙ্গে পুনরায় ফোনে কথা হলে পরিবারের সবার বুক থেকে যেন এক বিশাল পাথর নেমে যায়। বাবার নিরাপদে বেঁচে ফেরার আনন্দে চট্টগ্রাম নগরীর ওই পরিবারে স্বস্তি নেমে এলেও সাগরের সেই অনিশ্চিত কয়েক মুহূর্তের স্মৃতি হয়তো তাঁরা কোনোদিনই ভুলতে পারবেন না।
















