ভিক্ষার থালা ফেলে এখন আত্মবিশ্বাসী দোকানি বুলবুলি: চুয়াডাঙ্গা প্রশাসনের সহায়তায় নতুন জীবন

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

গতকাল যাঁর দিন কাটত মানুষের দ্বারে দ্বারে হাত পেতে, আজ সেই নারী নিজেই এক মুদি দোকানের গর্বিত মালিক। অপমান আর গ্লানিভরা ভিক্ষাবৃত্তির জীবন পেছনে ফেলে চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার আলুকদিয়া ইউনিয়নের অসহায় বুলবুলি খাতুন এখন একজন আত্মবিশ্বাসী ও স্বাবলম্বী ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলা প্রশাসন ও উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের যৌথ পুনর্বাসন কার্যক্রমের মাধ্যমে তাঁকে একটি নতুন দোকানঘর ও সম্পূর্ণ মালামাল কিনে দেওয়া হয়েছে। সরকারি এই মানবিক সহায়তার হাত ধরে বুলবুলি খাতুনের জীবনে ফিরে এসেছে আত্মসম্মান ও নতুন বাঁচার প্রেরণা।

অতীতের দিনগুলোর কথা মনে পড়লে এখনো চোখ ভিজে ওঠে বুলবুলির। রোদ-বৃষ্টি মাথায় নিয়ে সারা দিন মানুষের বাড়ি বাড়ি ঘুরে চাল চেয়ে কোনোমতে বেঁচে থাকতেন তিনি। সারাদিন হাত পেতে বড়জোর ১০০ থেকে ১৫০ টাকা জুটত, যা দিয়ে কোনো রকমে একবেলা খেয়ে না খেয়ে দিন কাটত। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শরীরে ভর করছিল নানা রোগবালাই, অথচ পেটের দায়ে ভিক্ষা করা ছাড়া কোনো বিকল্প ছিল না। সমাজের অবহেলা আর কটুকথা সহ্য করেই দিন পার করছিলেন তিনি। তবে প্রশাসনের এই টেকসই পুনর্বাসন তাঁর সেই ধূসর জীবনে এনে দিয়েছে শতভাগ আলোর দিশা।

মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) সকালে চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তিথি মিত্র সরেজমিনে আলুকদিয়া ইউনিয়নে গিয়ে বুলবুলির দোকানটি পরিদর্শন করেন। এ সময় ইউএনও নিজে দোকানে গিয়ে বুলবুলির সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন, তাঁর পরিবারের সদস্যদের শারীরিক অবস্থার খোঁজ নেন এবং দোকানের সামগ্রিক বেচাকেনা ঘুরে দেখেন। পরিদর্শনকালে দেখা যায়, বুলবুলি খাতুন হাসিমুখে ক্রেতাদের কাছে প্রয়োজনীয় পণ্য ওজন করে দিচ্ছেন এবং আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে টাকা হিসাব করে ক্যাশ বাক্সে রাখছেন। প্রশাসনের এমন ইতিবাচক পদক্ষেপে স্থানীয় গ্রামবাসীরাও আনন্দ প্রকাশ করেন।

উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের আওতায় পরিচালিত ভিক্ষুক পুনর্বাসন প্রকল্পের অর্থায়নে বুলবুলির জন্য এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হয়েছে। দোকান নির্মাণ ও তাতে চাল, ডাল, তেল, চিনি, বিস্কুট, চা-পাতাসহ বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় মালামাল তুলে দিতে প্রশাসন প্রায় ৪৫ হাজার টাকা বরাদ্দ করে, যা আন্তর্জাতিক হিসাবে আনুমানিক $৩৭০ থেকে $৪০০ মার্কিন ডলারের সমান। কেবল খাদ্য বা নগদ টাকা দিয়ে সহায়তা করলে তা কিছুদিনের মধ্যে শেষ হয়ে যেত। কিন্তু আয়ের স্থায়ী একটি উৎস তৈরি করে দেওয়ায় বুলবুলির দীর্ঘমেয়াদে স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ তৈরি হলো।

নতুন জীবনের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বুলবুলি খাতুন জানান, দোকানে প্রতিদিন এখন প্রায় ১,৫০০ থেকে ২,০০০ টাকার পণ্য বিক্রি হচ্ছে, যেখান থেকে দিনে ৩০০ টাকার মতো লাভ থাকছে। ভিক্ষাবৃত্তির তুলনায় তাঁর আয়ের পরিমাণ প্রায় ১০০% থেকে ১৫০% পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। তিনি বলেন, মানুষের কাছে হাত পাতার চেয়ে নিজের দোকানে বসে সৎ উপায়ে এক টাকা আয় করাও অনেক বেশি সম্মানের। তিথি মিত্র আপা ও প্রশাসনের স্যারেরা আমাকে ভিক্ষুক থেকে দোকানের মালিক বানিয়েছেন, এই ঋণ আমি জীবনেও শোধ করতে পারব না।

চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তিথি মিত্র বলেন, সমাজের চরম অবহেলিত ও পিছিয়ে পড়া মানুষদের ভিক্ষাবৃত্তি থেকে মুক্ত করে স্থায়ী কর্মসংস্থানের মাধ্যমে স্বাবলম্বী করাই আমাদের প্রশাসনের মূল উদ্দেশ্য। কোনো মানুষকে সাময়িক খাবার বা খয়রাতি সাহায্যের বদলে যদি দীর্ঘমেয়াদি উপার্জনের ব্যবস্থা করে দেওয়া যায়, তবে সমাজের দৃশ্যপট দ্রুত বদলে যায়। তিনি উল্লেখ করেন, সদর উপজেলায় চিহ্নিত প্রকৃত ভিক্ষুকদের তালিকা তৈরি করে তাদের পুনর্বাসনের মাধ্যমে আগামী অর্থবছরের মধ্যে ভিক্ষাবৃত্তি অন্তত ৮০% কমিয়ে আনার লক্ষ্য নিয়ে কাজ চলছে। বুলবুলির মতো অন্যান্য সুবিধাবঞ্চিত অসহায় মানুষদেরও আগামীতে পর্যায়ক্রমে নতুন ব্যবসা গড়ে দেওয়া হবে।

আলুকদিয়া ইউনিয়নের স্থানীয় বাসিন্দারাও বুলবুলির জীবনের এই ইতিবাচক রূপান্তরকে সানন্দে গ্রহণ করেছেন। গ্রামের প্রতিবেশীরা এখন সচেতনভাবেই অন্য দোকানে না গিয়ে নিয়মিত বুলবুলির দোকান থেকেই চাল, ডাল ও তেলসহ দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় পণ্যসামগ্রী কিনছেন, যাতে তাঁর ব্যবসা আরও ভালো চলে। স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ নেতারাও সার্বিক সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন। প্রশাসনের সঠিক নজরদারি, সময়োপযোগী পদক্ষেপ আর সহমর্মিতাপূর্ণ উদ্যোগ কীভাবে সমাজের সবচেয়ে প্রান্তিক মানুষের জীবনে স্থায়ী আশার প্রদীপ জ্বালাতে পারে, চুয়াডাঙ্গার বুলবুলি খাতুনের এই ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প আজ তারই এক অনন্য বাস্তব উদাহরণ।

সম্পর্কিত নিবন্ধ