হরমুজ প্রণালি ও যুদ্ধ বন্ধে ফের আলোচনার আভাস: কাতারের মাধ্যমে ওয়াশিংটনকে তেহরানের শর্ত

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

টানা প্রায় সাত মাস ধরে রক্তক্ষয়ী সংঘাত চলার পর অবশেষে যুদ্ধ বন্ধের পথ খুঁজতে আবারও কূটনৈতিক আলোচনায় ফেরার জোরালো ইঙ্গিত দিয়েছে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র। নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের আবহে দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে এই বরফ গলার আভাস মিলল। তেহরান স্পষ্ট জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র যদি তাদের ওপর আরোপিত বন্দর অবরোধ প্রত্যাহার করে এবং সামরিক আগ্রাসন কমায়, তবে মাত্র ৭ দিনের মধ্যে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি জাহাজ চলাচলের জন্য পুনরায় খুলে দেওয়া হবে। অন্যদিকে ওয়াশিংটনও জানিয়েছে, বাস্তবসম্মত ইতিবাচক ফল আসার সম্ভাবনা থাকলে তারা সংলাপে বসতে পুরোপুরি প্রস্তুত।

চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার মধ্য দিয়ে এই বিধ্বংসী যুদ্ধ শুরু হয়। এর জবাবে ইরানও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন মার্কিন ঘাঁটি ও ইসরায়েলে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। জুনের মাঝামাঝি একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি হলেও জুলাই মাসে ট্রাম্প ও পেজেশকিয়ানের মধ্যে স্বাক্ষরিত অন্তর্বর্তী চুক্তি ভেস্তে যায়। হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের প্রায় ২০% থেকে ২৫% জ্বালানি তেল পরিবাহিত হয়। এই জলপথ অবরুদ্ধ থাকায় বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি $১১০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে, যার ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে দৈনিক প্রায় $৫০০ মিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হচ্ছে। দীর্ঘ সাত মাস পর সংকট নিরসনে নতুন কূটনৈতিক সুযোগ তৈরি হলো।

জাতিসংঘ অধিবেশনে যোগ দিতে বর্তমানে নিউইয়র্কে অবস্থান করছেন ইরানের সংস্কারপন্থী প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও অধিবেশনের উদ্বোধনী পর্ব শেষে বিশ্বনেতাদের সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক করছেন। এর আগে গত রবিবার ট্রাম্প ইরানি প্রেসিডেন্টের সঙ্গে যেকোনো সময় আলোচনায় বসার আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন। তবে ইরানের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, প্রেসিডেন্টের সঙ্গে ট্রাম্পের সরাসরি বৈঠকের কোনো সূচি এখনই নেই। তবে কাতারের মধ্যস্থতায় পাঠানো যুদ্ধবিরতির খসড়া প্রস্তাবটি নিয়ে ওয়াশিংটনের সঙ্গে দরকষাকষি করার পূর্ণ আইনি ও কূটনৈতিক ক্ষমতা ইরানি প্রতিনিধিদলের রয়েছে।

ইরানের প্রস্তাবের প্রতিক্রিয়ায় মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেন, ডোনাল্ড ট্রাম্প একজন বাস্তববাদী ব্যবসায়ী নেতা এবং কাণ্ডজ্ঞান বলে কারও সঙ্গে কথা বলায় কোনো ক্ষতি নেই। তবে তিনি সতর্ক করে দেন যে, আলোচনার টেবিল কখনোই ওয়াশিংটনের দুর্বলতা নয়। রুবিও উল্লেখ করেন, ইরানি প্রশাসন দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মুজতবা খামেনির চূড়ান্ত নির্দেশনায় পরিচালিত হয়। তাই তেহরানকে কোনো অবস্থাতেই পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকারী হতে দেওয়া হবে না এবং এ ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র ১০০% আপসহীন থাকবে বলে তিনি দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।

যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর অবস্থানের বিপরীতে ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, ইরানি জনগণ কোনো অবস্থাতেই মার্কিন আধিপত্য ও আগ্রাসনের মুখে নতি স্বীকার বা আত্মসমর্পণ করবে না। ট্রাম্প কখনোই নিজের খেয়ালখুশি ইরানি জাতির ওপর চাপিয়ে দিতে পারেন না। অন্যদিকে সংকট নিরসনে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প মঙ্গলবার উপসাগরীয় অঞ্চলের ৬টি আরব দেশের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে এক জরুরি রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেছেন। উপসাগরীয় তেলসমৃদ্ধ রাষ্ট্রগুলো নিজেদের বাণিজ্যের স্বার্থে অবিলম্বে হরমুজ প্রণালির অচলাবস্থা নিরসন চায়। কারণ এই দেশগুলোর অর্থনীতি প্রায় ৮০% নির্ভর করে নির্বিঘ্ন সমুদ্র বাণিজ্যের ওপর।

মধ্যপ্রাচ্যের এই উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যেই নতুন করে সামরিক উপস্থিতির ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাজ্য। ইয়েমেনের ইরানপন্থী সশস্ত্র গোষ্ঠী হুতিদের ধারাবাহিক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা প্রতিহত করতে সৌদি আরবকে ‘সীমিত সামরিক সহায়তা’ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ব্রিটিশ সরকার। জাতিসংঘ অধিবেশনে যোগ দিতে নিউইয়র্ক যাওয়ার পথে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম জানান, সৌদি সরকারের আনুষ্ঠানিক অনুরোধের ভিত্তিতেই রাজকীয় বিমানবাহিনী (আরএএফ) সৌদি যুদ্ধবিমানগুলোকে মাঝআকাশে জ্বালানি সরবরাহ করবে। আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথ নিরাপদ রাখতে ও জ্বালানি সরবরাহ সচল রাখতেই এই অস্থায়ী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতি বিশ্লেষকরা মনে করছেন, চলমান সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক অর্থনীতি ও বিশ্বশান্তিকে এক গভীর খাদের কিনারায় এনে দাঁড় করিয়েছে। সামরিক সংঘাত দীর্ঘায়িত হওয়ায় দুই দেশই এখন অর্থনৈতিকভাবে চরম ক্লান্ত এবং একটি সম্মানজনক সমঝোতার পথ খুঁজছে। নিউইয়র্কের সাধারণ অধিবেশনকে যদি উভয় পক্ষ একটি নির্ভরযোগ্য কূটনৈতিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজে লাগাতে পারে, তবে আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই হরমুজ প্রণালির অচলাবস্থা কেটে গিয়ে পুরো অঞ্চলে দীর্ঘমেয়াদি শান্তি ফিরে আসার সম্ভাবনা অন্তত ৭০% বৃদ্ধি পাবে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ