রাজধানীতে পৃথক সড়ক দুর্ঘটনায় দুই মোটরসাইকেল আরোহী নিহত: ভাটারা ও বনানীতে রক্ত ঝরল সড়কে

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

রাজধানীর ব্যস্ত সড়কে পৃথক দুটি মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় দুই মোটরসাইকেল আরোহী নিহত হয়েছেন। মঙ্গলবার দুপুর ও রাতের ব্যবধানে ভাটারা ও বনানী এলাকায় এই রক্তক্ষয়ী দুর্ঘটনা দুটি ঘটে। নিহত ব্যক্তিরা হলেন ভাটারা এলাকায় মো. সুমন (২০) এবং বনানীতে হাসান ইমাম সোহেল (৪৫)। এসব দুর্ঘটনায় আরও দুই মোটরসাইকেল আরোহী গুরুতর আহত হয়ে বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। হঠাৎ ঘটে যাওয়া এই দুটি দুর্ঘটনায় নিহতদের পরিবারে চলছে শোকের মাতম। অন্যদিকে রাজধানীর সড়কে যাত্রীবাহী বাস ও ঘাতক ট্রাকের এমন লাগামহীন চলাচলে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সাধারণ পথচারী ও নগরবাসী।

ভাটারা থানার সাঈদনগর এলাকায় রাতের দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান পেশায় গ্রিল মিস্ত্রি তরুণ মো. সুমন। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আহত বন্ধু রবিউল (২২) জানান, মঙ্গলবার রাতে দুই বন্ধু মিলে সুমনের ব্যক্তিগত মোটরসাইকেলে করে কিছুটা স্বস্তির খোঁজে ঘুরতে বের হয়েছিলেন। রাত পৌনে দশটার দিকে তারা সাঈদনগর প্রধান সড়কে পৌঁছালে দ্রুতগতির একটি বেপরোয়া মালবাহী ট্রাক তাদের মোটরসাইকেলটিকে সজোরে ধাক্কা দেয়। ট্রাকের ধাক্কায় দুই বন্ধুই ছিটকে পড়ে পিচঢালা সড়কে লুটিয়ে পড়েন এবং রক্তক্ষরণে গুরুতর আহত হন। পথচারীরা তাদের উদ্ধার করে প্রথমে স্থানীয় একটি হাসপাতালে এবং পরে অবস্থার অবনতি হলে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে আসার পর কর্তব্যরত চিকিৎসকরা রাত ১০টার দিকে সুমনকে মৃত ঘোষণা করেন। ঢামেক পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ উপপরিদর্শক (এসআই) মো. সেলিম হোসেন ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, সুমনের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য হাসপাতালের জরুরি মর্গে রাখা হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট ভাটারা থানাকে জানানো হয়েছে। আহত রবিউল জরুরি বিভাগে চিকিৎসাধীন আছেন। নিহত সুমনের গ্রামের বাড়ি নোয়াখালী সদর উপজেলার আজিজুল্লাপুর গ্রামে এবং তার বাবার নাম নুরুন্নবীর লিটন। তিনি দীর্ঘদিন ধরে সপরিবারে ভাটারার নতুন বাজার এলাকায় বসবাস করে আসছিলেন।

এর আগে একই দিন দুপুর সোয়া একটার দিকে বনানী এলাকায় ঘটে আরেক হৃদয়বিদারক দুর্ঘটনা। মোহাম্মদপুরের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের চাকরিজীবী হাসান ইমাম সোহেল তাঁর এক সহকর্মীর মোটরসাইকেলের পেছনে বসে দাপ্তরিক কাজে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার দিকে যাচ্ছিলেন। পথিমধ্যে বনানীর চেয়ারম্যানবাড়ি ও সৈনিক ক্লাবের মাঝামাঝি স্থানে পৌঁছালে ‘লাবিব পরিবহন’-এর একটি বেপরোয়া যাত্রীবাহী বাস তাদের মোটরসাইকেলটিকে পেছন দিক থেকে প্রচণ্ড বেগে ধাক্কা মারে। ধাক্কায় দুই আরোহীই রাজপথে ছিটকে পড়েন এবং সোহেল বাসের সামনে পড়ে পেছনের চাকায় পিষ্ট হয়ে ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান।

খবর পেয়ে বনানী থানা পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ মর্গে পাঠায়। বনানী থানার এসআই জুয়েল বিশ্বাস জানান, চালক সহকর্মীকে আহত অবস্থায় দ্রুত কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হয়। চিকিৎসক জানিয়েছেন, তিনি বর্তমানে শঙ্কামুক্ত রয়েছেন। পুলিশ ঘাতক লাবিব পরিবহনের বাসটি তাৎক্ষণিকভাবে জব্দ করেছে, তবে চালক ও সহকারী ভিড়ের মধ্যে পালিয়ে গেছে। নিহত সোহেলের গ্রামের বাড়ি কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলায়। এ ঘটনায় ঘাতক চালককে গ্রেপ্তারে সাঁড়াশি অভিযান চলছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

সড়ক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের তথ্যমতে, বর্তমানে বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির প্রায় ৪০% থেকে ৪৫% ঘটনাই মোটরসাইকেল কেন্দ্রিক। অতিরিক্ত গতি, বেপরোয়া ওভারটেকিং এবং চালকদের ট্রাফিক আইন না মানার প্রবণতায় দুর্ঘটনা দিন দিন বেড়েই চলেছে। বিশ্বব্যাংক ও বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সড়কে এমন মৃত্যুর কারণে প্রতি বছর জাতীয় অর্থনীতিতে আনুমানিক $৪ থেকে $৫ বিলিয়ন ডলার সমমূল্যের ব্যাপক ক্ষতি সাধিত হয়, যা দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ১.৫% থেকে ২% এর সমান।

রাজধানীর রাজপথে চালকদের এমন বেপরোয়া মানসিকতা ও রেষারেষি বন্ধে এখনই ট্রাফিক আইনের ১০০% কঠোর বাস্তবায়ন দাবি করেছেন সচেতন নাগরিকরা। নিহতের পরিবারগুলো ঘাতক চালকদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ নিশ্চিতের দাবি জানিয়েছে। সড়ক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যদি সড়কে রাতের বেলায় ট্রাক ও দিনে বাসের গতিসীমা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ না করা যায়, তবে সুমন ও সোহেলের মতো কর্মক্ষম তরুণদের এমন করুণ অকালমৃত্যু কোনোভাবেই থামানো সম্ভব হবে না।

সম্পর্কিত নিবন্ধ