ভিডিও কেলেঙ্কারি থেকে স্ত্রীর মৃত্যু: রিমান্ডে এমপি গাজী নজরুল ও প্রথম স্ত্রী

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

ব্যক্তিগত মুহূর্তের ভিডিও ফাঁসের পর দল থেকে বহিষ্কার এবং সর্বশেষ দ্বিতীয় স্ত্রীর রহস্যজনক মৃত্যু মাত্র দুই মাসের ব্যবধানে তীব্র বিতর্কের মুখে পড়েছেন সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম। রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের সরকারি ন্যাম ভবনের ফ্ল্যাট থেকে তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম খাতুনের (১৯) ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধারের পর রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। এই ঘটনায় দায়ের করা আত্মহত্যায় প্ররোচনা মামলায় সোমবার ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত গাজী নজরুল ও তাঁর প্রথম স্ত্রী মাকছুদা বেগমকে চার দিনের পুলিশি রিমান্ডে পাঠিয়েছেন। জামায়াতে ইসলামীর মনোনয়নে তিনবার নির্বাচিত এই প্রবীণ রাজনীতিক এখন জীবনের সবচেয়ে বড় আইনি ও নৈতিক সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছেন।

গাজী নজরুল ইসলাম ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালের পর সর্বশেষ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ভোটে জয়ী হয়ে তৃতীয়বারের মতো সংসদে আসেন। কিন্তু গত জুলাই মাসের শেষ দিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর একটি ঘনিষ্ঠ ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে দেশজুড়ে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়। দলের নেতা-কর্মীরা শুরুতে ভিডিওটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দিয়ে তৈরি বলে দাবি করলেও গাজী নজরুল নিজেই জানান যে ভিডিওর তরুণী তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম। তিনি দাবি করেছিলেন, প্রথম স্ত্রীর সম্মতিতে গত ১৭ জুন পারিবারিকভাবে তাঁদের বিয়ে হয়। তবে দলীয় তদন্তে নৈতিক স্খলন প্রমাণিত হওয়ায় ২২ জুলাই জামায়াত গঠনতন্ত্রের ৬২ নম্বর ধারা অনুযায়ী তাঁকে দল থেকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করে।

দলীয় পদ হারানোর পর গাজী নজরুলের সংসদ সদস্য পদ বাতিল হবে কি না, তা নিয়ে সংসদে বড় বিতর্ক সৃষ্টি হয়। সংবিধান অনুযায়ী দল বহিষ্কার করলেই পদ সরাসরি বাতিল হয় না, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেন স্পিকার। জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বিষয়টি নিয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত দেননি। তবে সংসদীয় কার্যক্রমে নজরুলকে পুরোপুরি একঘরে করে ফেলা হয়। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় ও সরকারি প্রতিশ্রুতি সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি থেকে তাঁর নাম বাদ দেওয়া হয়। সংসদ সদস্য হিসেবে তিনি প্রতি মাসে রাষ্ট্রের কাছ থেকে গাড়িভাড়া ও ভাতাসহ প্রায় $২,৫০০ থেকে $৩,০০০ ডলার সমমূল্যের সরকারি সুবিধা পেতেন। কিন্তু রাজনৈতিক অঙ্গনে তাঁর জায়গা দিন দিন সংকুচিত হয়ে আসে।

সেই বিতর্কের রেশ কাটতে না কাটতেই রোববার ২০ সেপ্টেম্বর বিকেলে ন্যাম ভবনের ফ্ল্যাট থেকে মরিয়মের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এজাহারের তথ্যমতে, ঘটনার দিন দুপুর আনুমানিক ৩:০০টা থেকে বিকেল ৫:৩০টার মধ্যে কোনো এক সময় মরিয়ম আত্মহত্যার পথ বেছে নেন। বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে গাজী নজরুল ফোন করে মরিয়মের বাবা মো. মাসুম বিল্লাহকে দ্রুত বাসায় আসতে বলেন। পরে স্বজন ও পুলিশের উপস্থিতিতে দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে ঝুলন্ত মরদেহ পাওয়া যায়। মরদেহের পাশ থেকে পুলিশ একটি কথিত সুইসাইড নোট বা আত্মহত্যার চিঠি উদ্ধার করে, যেখানে বিশ্বাসভঙ্গ, মানসিক প্রতারণা ও কাছের মানুষদের নিষ্ঠুর আচরণের কথা লেখা রয়েছে।

মেয়ের মৃত্যুর ঘটনায় রাতেই শেরেবাংলা নগর থানায় মামলা দায়ের করেন বাবা মাসুম বিল্লাহ। মামলায় গাজী নজরুল, তাঁর প্রথম স্ত্রী মাকছুদা বেগম এবং মরিয়মের মামা ওবায়দুর রহমানকে আসামি করা হয়। বাবার অভিযোগ, বিয়ের পর থেকেই মরিয়মকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন সইতে হচ্ছিল। তিনি পরিবারের সদস্যদের কাছে মুঠোফোনে কান্নাকাটি করে এই দুঃসহ জীবনের কথা জানিয়েছিলেন। বিয়ের মধ্যস্থতাকারী মামা ওবায়দুরের ভূমিকা এবং প্রথম স্ত্রী মাকছুদার নির্যাতন মরিয়মকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছে বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়। পুলিশ রাতেই এমপি ও তাঁর প্রথম স্ত্রীকে থানায় নিয়ে গ্রেপ্তার দেখায়।

সোমবার পুলিশ আসামিদের আদালতে হাজির করে ১০ দিনের রিমান্ড চাইলে আদালত চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। এদিকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রায় ৯০% থেকে ৯৫% নাগরিক এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে ন্যায়বিচারের দাবি তুলেছেন। স্থানীয় রাজনীতিতেও এই ঘটনা গভীর ক্ষোভ তৈরি করেছে। মাত্র ৬০ দিনের ব্যবধানে একজন নির্বাচিত সংসদ সদস্যের এমন নাটকীয় অধঃপতন সমাজকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। রিমান্ডে নেওয়া এমপি ও তাঁর প্রথম স্ত্রীকে জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে মরিয়মের অস্বাভাবিক মৃত্যুর পেছনের মূল রহস্য উদ্ঘাটনের চেষ্টা করছে তদন্তকারী সংস্থা।

সম্পর্কিত নিবন্ধ