জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার সরাসরি প্রভাব পড়েছে পণ্য পরিবহনের ওপর। যশোরের বৃহত্তম পাইকারি সবজির মোকাম বারীনগর এবং দেশের প্রধান স্থলবন্দর বেনাপোল থেকে ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় পণ্য পাঠাতে এখন অতিরিক্ত ভাড়া গুনতে হচ্ছে ব্যবসায়ীদের। মোকামগুলো থেকে পণ্যবাহী যানবাহনের ভাড়া এক লাফে এক থেকে পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত বেড়ে গেছে। হঠাৎ পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় পাইকারি ব্যবসায়ী ও কৃষকেরা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন, যার চূড়ান্ত প্রভাব গিয়ে পড়ছে সাধারণ ভোক্তাদের নিত্যদিনের বাজারের ওপর।
রোববার রাতে সরকার এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম লিটারপ্রতি এক ধাক্কায় ২০ টাকা বাড়ায়। নতুন দর অনুযায়ী ডিজেল প্রতি লিটার ১৩৫ টাকা, পেট্রল ১৬০ টাকা, অকটেন ১৬৫ টাকা এবং কেরোসিন ১৫৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এই মূল্যবৃদ্ধির কারণে কেবল ডিজেলের দামই একবারে প্রায় ১৭.৪% বৃদ্ধি পেয়েছে। দেশের অভ্যন্তরীণ পণ্য পরিবহনের সিংহভাগ যানবাহন ডিজেলে চলায় ঘোষণার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পরিবহন মালিকেরা ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যানের ভাড়া বাড়িয়ে দেন। পরিবহন সংশ্লিষ্টদের দাবি, তেলের পেছনে ট্রিপপ্রতি অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় হওয়ায় ভাড়া বাড়ানো ছাড়া তাঁদের কোনো উপায় ছিল না।
বারীনগর পাইকারি সবজির মোকামে গিয়ে দেখা যায়, সোমবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত মোট ১৫টি ট্রাকে বিভিন্ন জাতের সবজি বোঝাই করে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পাঠানো হয়েছে। এর মধ্যে চার ট্রাক সবজি গেছে রাজধানীর যাত্রাবাড়ী ও মিরপুর কাঁচাবাজারে। এছাড়া বাকি ১১টি ট্রাক শরিয়তপুর, পটুয়াখালী, মাদারীপুর, ভোলা, বরগুনা, বরিশাল ও চট্টগ্রামের পাইকারি মোকামে পাঠানো হয়। আগে বারীনগর থেকে ঢাকায় একটি পাঁচ টন ধারণক্ষমতার ট্রাকের ভাড়া ছিল ১৯ হাজার টাকা। কিন্তু সোমবার তেলের দাম বাড়ার কারণে চালকেরা এক হাজার টাকা বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা ভাড়া নিয়েছেন।
বারীনগর মোকামের নিয়মিত সবজি ব্যবসায়ী আতিয়ার রহমান জানান, সোমবার তিনি কৃষকদের কাছ থেকে পটোল, শিম ও মুলা কিনে ঢাকায় পাঠিয়েছেন। কিন্তু পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় তিনি মারাত্মক আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। তিনি বলেন, ‘রোববার বারীনগর বাজার থেকে কৃষকদের কাছ থেকে প্রতি কেজি পটোল ৩০ টাকায় কিনেছি। সেই পটোল সোমবার সকালে ঢাকার যাত্রাবাড়ী আড়তে নিয়ে বিক্রি করতে হয়েছে মাত্র ৩২ টাকা কেজি দরে। অথচ গাড়িভাড়াসহ অন্যান্য খরচ মিলিয়ে প্রতি কেজিতে আমার ৭ থেকে ৮ টাকা লোকসান হয়েছে।’ তিনি জানান, ঢাকায় সবজির সরবরাহ ভালো থাকলেও ক্রেতাদের কেনাকাটার সামর্থ্য কমে গেছে।
একই সংকটের চিত্র দেখা গেছে দেশের সর্ববৃহৎ বেনাপোল স্থলবন্দরেও। এই বন্দর দিয়ে প্রতিদিন কোটি কোটি টাকা মূল্যের কিংবা লাখ লাখ মার্কিন ডলারের ($) শিল্প কাঁচামাল ও আমদানি পণ্য দেশে আসে। স্থলবন্দরটি থেকে ঢাকায় সাড়ে ১২ টনের ট্রাকে পণ্য পাঠাতে এখন অতিরিক্ত ৪,৫০০ থেকে ৫,০০০ টাকা পর্যন্ত বেশি গুনতে হচ্ছে। এছাড়া সাড়ে ১০ টন ধারণক্ষমতার একটি কাভার্ড ভ্যানে ঢাকার কাঁচপুরে পণ্য পাঠাতে আড়াই থেকে তিন হাজার টাকা বাড়তি ব্যয় হচ্ছে। বন্দর এলাকার ট্রান্সপোর্ট এজেন্সির মালিকেরা জানান, খোলা ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যানের ভাড়া বৃদ্ধির কারণে আমদানিকারকদের ওপর খরচ অনেক বেড়ে গেছে।
বেনাপোলের অর্পা-অপ্সরা ট্রান্সপোর্ট এজেন্সির স্বত্বাধিকারী হাফিজুর রহমান পরিস্থিতির বিবরণ দিয়ে বলেন, সাড়ে ১০ টনের একটি কাভার্ড ভ্যানে করে তৈরি পোশাকপণ্য ঢাকার কাঁচপুরে নিতে সোমবার ২২ হাজার টাকা ভাড়া ধার্য করা হয়েছে। অথচ গত শনিবারও এই রুটে গাড়ির ভাড়া ছিল ১৮ থেকে ১৯ হাজার টাকার মধ্যে। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পর একদিনের ব্যবধানেই পরিবহন ভাড়া তিন থেকে চার হাজার টাকা বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। তিনি জানান, ১২ টনের খোলা ট্রাকের ক্ষেত্রে ভাড়া বেড়েছে সাড়ে চার থেকে পাঁচ হাজার টাকা। ফলে ব্যবসায়ীরা পণ্য গন্তব্যে পাঠাতে গিয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন।
অর্থনীতিবিদ ও বাজার বিশ্লেষকদের মতে, পণ্যবাহী যানবাহনের ভাড়া এভাবে গড়ে ১০% থেকে ১৫% পর্যন্ত বেড়ে যাওয়ায় পুরো সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর তীব্র চাপ তৈরি হবে। যেকোনো কাঁচামাল বা কৃষিপণ্য পরিবহনে অতিরিক্ত ব্যয় যুক্ত হওয়া মানেই খুচরা বাজারে সাধারণ ক্রেতাদের সেই বাড়তি টাকা পরিশোধ করতে হবে। ইতিমধ্যে লাগামহীন মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার উচ্চ ব্যয়ের চাপে সাধারণ নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষ চরম সংকটে দিন কাটাচ্ছেন। পরিবহন খরচের এই বাড়তি ধাক্কা নিত্যপণ্যের বাজারকে আরও উসকে দেবে, যা সামাল দেওয়া সাধারণ মানুষের পক্ষে অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়বে।
















