ইয়েমেনে হুতিদের ওপর শেষ মুহূর্তে মার্কিন হামলা স্থগিত করলেন ট্রাম্প

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

সৌদি আরবের বারবার অনুরোধ সত্ত্বেও ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের অবস্থানে বিমান হামলা চালানোর সিদ্ধান্ত শেষ মুহূর্তে স্থগিত করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। মার্কিন যুদ্ধবিমানগুলোতে যখন বোমা তোলা হচ্ছিল এবং সমরনায়কেরা লক্ষ্যবস্তুর তালিকা চূড়ান্ত করেছিলেন, ঠিক তখনই এই সামরিক অভিযান থামিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেন তিনি। মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের বিরুদ্ধে শুরু হওয়া সর্বাত্মক সংঘাত প্রায় ৭ মাস পেরিয়ে গেলেও ওয়াশিংটন তা এখনো গুটিয়ে আনতে পারেনি। এমন টালমাটাল বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে ইয়েমেনে নতুন আরেকটি যুদ্ধক্ষেত্রে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি এবং নিজ প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের তীব্র আপত্তির কারণেই ট্রাম্প এই নাটকীয় সিদ্ধান্ত নেন।

হোয়াইট হাউস সূত্রে জানা গেছে, হুতিদের বিরুদ্ধে যৌথ সামরিক সহায়তার আরজি জানিয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে সরাসরি ফোন করেছিলেন সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান। ফোন পাওয়ার আগের দিনই ট্রাম্প ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টাদের জানিয়েছিলেন যে তিনি ইয়েমেনের যুদ্ধে জড়ানোর পক্ষে নন। তবে সৌদি যুবরাজের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনার পর তিনি অবস্থান বদলে মার্কিন প্রতিরক্ষা সদর দপ্তর পেন্টাগনকে বিমান হামলার পূর্ণ প্রস্তুতি নিতে বলেন। কিন্তু নাটকীয়ভাবে রোববার দুপুরের মধ্যে ট্রাম্প নিজের সিদ্ধান্ত আবার পরিবর্তন করেন। পরবর্তীতে ফক্স নিউজকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জানান, আমেরিকা হুতিদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করছে এবং হুতিরা মার্কিন বাহিনীর সঙ্গে সরাসরি লড়াইয়ে না জড়ানোর প্রতিশ্রুতি এখনো পর্যন্ত মেনে চলছে।

হোয়াইট হাউসের শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা ও উপদেষ্টাদের বড় অংশই সৌদি আরবের এই লড়াইয়ে আমেরিকার সরাসরি যুক্ত হওয়ার ঘোর বিরোধী ছিলেন। ইরানের সঙ্গে চলমান অচলাবস্থার কারণে আমেরিকান সামরিক বাহিনী বর্তমানে আন্তর্জাতিকভাবে চরম চাপের মুখে রয়েছে। তাছাড়া ২০২৫ সালের বসন্তে লোহিত সাগরে চলা ৫০ দিনেরও বেশি সময়ের সামরিক অভিযানে তিক্ত ও ব্যয়বহুল অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয় যুক্তরাষ্ট্র। ওই অভিযানের প্রথম মাসেই ওয়াশিংটনের প্রায় $১ বিলিয়ন ডলার বা এক শ কোটি ডলারের অস্ত্র ও গোলাবারুদ খরচ হয়ে যায়। পাশাপাশি মার্কিন বিমানবাহী রণতরি থেকে সাগরে পড়ে ধ্বংস হয় প্রতিটি প্রায় $৬ কোটি ৭০ লাখ ডলার মূল্যের দুটি সর্বাধুনিক ‘এফ/এ-১৮ সুপার হর্নেট’ যুদ্ধবিমান।

সেই সময় মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড হুতিদের রাডার সিস্টেম, আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ও ড্রোন তৈরির কারখানাসহ ১,০০০টিরও বেশি লক্ষ্যবস্তুতে প্রচণ্ড আঘাত হেনেছিল। তবে টানা প্রায় ৮ সপ্তাহের ভারী মার্কিন বোমাবর্ষণ সহ্য করেও হুতিরা নিজেদের অবস্থানে টিকে থাকে এবং উল্টো আমেরিকার কয়েকটি ব্যয়বহুল সামরিক ড্রোন গুলি করে নামায়। একপর্যায়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজেই হুতিদের সঙ্গে যুদ্ধবিরতির আকস্মিক ঘোষণা দিয়ে সামরিক অভিযান গুটিয়ে নেন। যুদ্ধবিরতির সময়কালকে কাজে লাগিয়ে হুতিরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে তাদের ড্রোন ও দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থার ব্যাপক আধুনিকায়ন ঘটিয়েছে। সমর বিশ্লেষকদের মতে, শুধু বিমান হামলা চালিয়ে তাদের হটানো প্রায় অসম্ভব।

হামলা স্থগিত করার পেছনে লোহিত সাগরের বাব আল-মানদেব প্রণালির সংকীর্ণ নৌপথের নিরাপত্তার বিষয়টিও বড় প্রভাব ফেলেছে। বর্তমানে এই কৌশলগত জলপথের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ হুতিদের হাতে রয়েছে, যেখান দিয়ে বৈশ্বিক বাণিজ্যের প্রায় ১২% থেকে ১৫% পণ্য ও জ্বালানি পরিবাহিত হয়। সৌদি আরবের বিরুদ্ধে হুতিরা নতুন করে বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরু করে লোহিত সাগরে চলাচলকারী সৌদি জাহাজে ড্রোন হামলা চালাচ্ছে। ট্রাম্পের উভয়সংকট মূলত এখানেই—হুতিরা সরাসরি আমেরিকান রণতরিতে হামলা না চালালেও প্রধান মিত্র সৌদি আরবের ওপর আক্রমণ অব্যাহত রেখেছে। এতে জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে এবং তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি অস্বাভাবিক বৃদ্ধির শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

অন্যদিকে সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেনি সরকারি বাহিনীর চরম ব্যর্থতা ওয়াশিংটনের সামরিক সংশয় আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, হুতিবিরোধী জোটে থাকা স্থানীয় দলগুলোর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী এবং তাদের ৮০% শক্তি অপচয় হয় অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার দ্বন্দ্বে। সম্প্রতি আল-জাওফ ও মারিব অঞ্চলে হুতি যোদ্ধাদের মুখোমুখি হয়ে সৌদি সমর্থিত সরকারি বাহিনী যুদ্ধক্ষেত্র ছেড়ে ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে। এমন এক অকার্যকর বাহিনীকে আকাশপথে সহায়তা দিতে গিয়ে মার্কিন সেনাদের নতুন চোরাবালিতে না জড়ানোর পক্ষে একমত হয়েছেন পেন্টাগনের শীর্ষ কর্মকর্তারা। সার্বিক ঝুঁকি বিবেচনা করে আপাতত হুতিদের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ স্থগিত রাখাই শ্রেয় মনে করছেন ট্রাম্প।

সম্পর্কিত নিবন্ধ