জ্বালানি খাতে রাতারাতি বড় ধরনের পরিবর্তন না এনে সরকার তেল ও গ্যাস নীতিতে ধারাবাহিকতা বজায় রাখবে বলে জানিয়েছেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম। তিনি বলেন, ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশের সার্বিক বাস্তবতা কিংবা রাষ্ট্রীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা রাতারাতি বদলে যায়নি। তাই জাতীয় স্বার্থ ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় বর্তমান নীতি বজায় রাখার পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। সোমবার ২১ সেপ্টেম্বর দুপুর ১২:৩০টায় যশোর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষ ‘মিত্রাক্ষর’-এ আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় তিনি এই মন্তব্য করেন।
যশোর জেলার সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, চলমান উন্নয়ন কর্মকাণ্ড এবং সরকারি কাজের তদারকি ও সমন্বয়ের লক্ষ্যে এই সভার আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রতিমন্ত্রী উল্লেখ করেন, দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির চাকা সচল রাখতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহের বিকল্প নেই। হঠাৎ করে জ্বালানি নীতিতে বড় কোনো পরিবর্তন আনলে শিল্পকারখানার উৎপাদন খাত ও সাধারণ জনগণের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে। এই বাস্তবতায় সরকার প্রচলিত ব্যবস্থার ধারাবাহিকতা রক্ষার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি টেকসই জ্বালানি নিরাপত্তা গড়ে তোলার দিকে নজর দিচ্ছে।
জ্বালানি আমদানির ওপর মাত্রাতিরিক্ত নির্ভরতা কমাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধির সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা তুলে ধরেন প্রতিমন্ত্রী। তিনি জানান, দেশের মোট উৎপাদিত বিদ্যুতে পরিবেশবান্ধব উৎসের হিস্যা অন্তত ১০% থেকে বাড়িয়ে ২০% করার সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য নিয়ে সরকার কাজ শুরু করেছে। এতে প্রতি বছর জীবাশ্ম জ্বালানি আমদানির পেছনে ব্যয় হওয়া কয়েক বিলিয়ন মার্কিন ডলার ($) সাশ্রয় করা সম্ভব হবে। সরকার ইতিমধ্যে বিভিন্ন সরকারি ভবনের ছাদে সোলার প্যানেল বা সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা বসানোর কার্যকর উদ্যোগ নিয়েছে। এর ফলে একদিকে যেমন সরকারি দপ্তরগুলোতে নিজস্ব বিদ্যুতের সক্ষমতা বাড়বে, অন্যদিকে গ্রিডের ওপর চাপ কমবে।
পরিবেশ দূষণ রোধে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়ে শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, নিয়ম না মেনে চলা অবৈধ ইটভাটাগুলো পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি করছে। দেশের প্রায় ৩০% থেকে ৪০% ইটভাটা এখনও পরিবেশগত ছাড়পত্র ছাড়াই পরিচালিত হচ্ছে, যা কৃষি জমি ও বায়ুর স্বাভাবিক মান নষ্ট করছে। সরকার এই অনিয়ম আর বরদাশত করবে না। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, যেসব ইটভাটা নির্ধারিত পরিবেশগত শর্ত মানবে না এবং নিয়মবহির্ভূতভাবে পরিচালিত হবে, প্রশাসন খুব দ্রুত সেগুলো পুরোপুরি বন্ধ করে দেবে। তবে পরিবেশবান্ধব নিয়ম মেনে যারা ব্যবসা করতে চান, তাঁদের সহায়তা দেওয়া হবে।
আসন্ন শারদীয় দুর্গাপূজা ঘিরে নিরাপত্তা ব্যবস্থা প্রসঙ্গে প্রতিমন্ত্রী স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সমন্বিতভাবে কাজ করার নির্দেশ দেন। তিনি বলেন, দেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করার যেকোনো অপচেষ্টা অত্যন্ত কঠোর হাতে দমন করতে হবে। পূজা চলাকালে জেলার ১০০% মণ্ডপেই সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা ও নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে। কোথায় কতটি পূজামণ্ডপ তৈরি হচ্ছে এবং কোথায় কী ধরনের বাড়তি নিরাপত্তা প্রয়োজন, তা পূজা শুরুর আগেই সুনির্দিষ্ট তালিকা তৈরি করে মূল্যায়ন করতে হবে। যেকোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে পূজা উদযাপন কমিটির সাথে নিবিড় যোগাযোগ বজায় রাখতে হবে।
মতবিনিময় সভায় সভাপতিত্ব করেন যশোরের জেলা প্রশাসক মোঃ আশেক হাসান। সভায় বিশেষ অতিথি ও আলোচক হিসেবে বক্তব্য দেন জেলা পরিষদের প্রশাসক দেলোয়ার খোকন, পৌর প্রশাসক রফিকুল হাসান, পুলিশ সুপার সৈয়দ রফিকুল ইসলাম, এসআরবি যশোর ক্যাম্প কমান্ডার ফজলে রাব্বি প্রিন্স এবং বিজিবির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। এছাড়া রাজনৈতিক ও পেশাজীবী প্রতিনিধিদের মধ্যে আলোচনায় অংশ নেন জেলা বিএনপির সভাপতি সাবেরুল হক সাবু, জেলা সিভিল সার্জন মাসুদ রানা, মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ আহমেদ জাহাঙ্গীর ফেরদৌস সুমন এবং জেলার ৯টি থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি)।
সভায় উপস্থিত বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তারা জেলার সার্বিক উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ও চলমান প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি তুলে ধরেন। প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম সব বিভাগের কর্মকর্তাদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে জনকল্যাণে সক্রিয় ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান। তিনি বলেন, প্রশাসনিক কাজে যেকোনো ধরনের কালক্ষেপণ পরিহার করে সাধারণ মানুষকে দ্রুত সেবা পৌঁছে দিতে হবে। সরকারি অর্থ ব্যয়ে সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা বজায় রেখে সব উন্নয়ন প্রকল্প নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বাস্তবায়নের তাগিদ দিয়ে তিনি সভার সমাপ্তি ঘোষণা করেন।
















