চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদা উপজেলায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সাবেক এক প্রভাবশালী নেতাকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। রোববার দিবাগত রাত ১১:০০টার দিকে উপজেলার হাউলী ইউনিয়নের পুরাতন হাউলী গ্রামে ঝটিকা অভিযান চালিয়ে তাঁকে নিজ বাড়ি থেকে আটক করা হয়। গ্রেপ্তার হওয়া ওই নেতার নাম রাসেল (৩২)। তিনি হাউলী ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সাবেক আহ্বায়ক এবং ওই গ্রামের আব্দুল আউয়ালের ছেলে। গ্রেপ্তারের পর রাতেই তাঁকে দামুড়হুদা মডেল থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। সোমবার ২১ সেপ্টেম্বর দুপুরে প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে কড়া পুলিশি পাহারায় তাঁকে চুয়াডাঙ্গার আদালতে পাঠিয়েছে পুলিশ।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গোপন তথ্যের ভিত্তিতে দামুড়হুদা মডেল থানার উপপরিদর্শক ও সহকারী উপপরিদর্শকের নেতৃত্বে পুলিশের একটি চৌকস দল রোববার রাতে পুরাতন হাউলী গ্রামে অভিযানে যায়। অভিযানের সময় পুলিশ দল রাসেলের বাড়িটি চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলে, যাতে তিনি কোনোভাবে পালিয়ে যেতে না পারেন। পরবর্তীতে তাঁর ঘরে তল্লাশি চালিয়ে তাঁকে আটক করা হয়। এর আগে তাঁর বিরুদ্ধে দামুড়হুদা থানায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে সুনির্দিষ্ট অভিযোগে একটি মামলা নথিভুক্ত করা হয়েছিল। মামলা হওয়ার পর থেকেই তিনি এলাকা ছেড়ে গা ঢাকা দিয়েছিলেন। সম্প্রতি তিনি গোপনে নিজ বাড়িতে ফিরেছেন এমন নিশ্চিত সংবাদের ভিত্তিতেই পুলিশ এই সফল অভিযান পরিচালনা করে।
উপজেলা জুড়ে সাম্প্রতিক সময়ে নাশকতামূলক তৎপরতা চালানো এবং বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টার অভিযোগে একাধিক মামলা দায়ের হয়েছে। দামুড়হুদা সীমান্তঘেঁষা এলাকা হওয়ায় প্রশাসন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে প্রায় ১০০% সতর্কতা বজায় রেখে নিয়মিত তল্লাশিচৌকি বসিয়েছে। অতীতের রাজনৈতিক অস্থিরতায় এলাকায় সরকারি ও ব্যক্তিগত সম্পত্তির বিপুল ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, গত কয়েক মাসের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে স্থানীয় ব্যবসায় প্রায় কয়েক লাখ টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে, যার পরিমাণ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের হিসাবে প্রায় $৫,০০০ থেকে $১০,০০০ ডলার সমমূল্যের সমান। এসব ঘটনার প্রেক্ষিতে পুলিশ জড়িতদের নামের তালিকা তৈরি করে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছে।
দামুড়হুদা মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শেখ মেজবাহ উদ্দিন এই গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, সন্ত্রাসবিরোধী আইনে দায়ের হওয়া একটি নিয়মিত মামলার তদন্ত ও আসামি গ্রেপ্তারের অংশ হিসেবেই রাসেলকে ধরা হয়েছে। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানান, কোনো সন্ত্রাসী বা নাশকতাকারীর পক্ষে রাজনৈতিক পরিচয় ঢাল হিসেবে কাজ করবে না। মামলার প্রাথমিক তদন্তে তাঁর বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট কিছু তথ্যপ্রমাণ পাওয়া গেছে। আইন অনুযায়ী সকল আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে সোমবার বেলা ১২:৩০টার পর তাঁকে সংশ্লিষ্ট আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে। একই মামলায় জড়িত থাকা অন্য আসামিদের দ্রুত আইনের আওতায় আনতে পুলিশের কয়েকটি দল মাঠে কাজ করছে।
সাবেক এই ছাত্রলীগ নেতা আটকের পর দামুড়হুদা ও আশেপাশের হাট-বাজারে সাধারণ মানুষের মধ্যে নানা আলোচনা শুরু হয়েছে। এলাকার প্রায় ৮৫% সাধারণ মানুষ ও সচেতন নাগরিক পুলিশের এই কঠোর ভূমিকাকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। সাধারণ বাসিন্দাদের বক্তব্য, রাতের আঁধারে এলাকায় কোনো ধরনের ভীতিকর পরিবেশ বা নাশকতার চেষ্টা যাতে না ঘটে, সেজন্য পুলিশের এমন কড়া নজরদারি অত্যন্ত প্রয়োজন। স্থানীয় দোকানদার ও ব্যবসায়ীরা জানান, এলাকায় স্থায়ী শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় থাকলে সাধারণ মানুষ নিরাপদে চলাফেরা করতে পারে এবং কাজকর্ম স্বাভাবিক থাকে। তাঁরা কোনো ধরনের রাজনৈতিক সংঘাত বা অপরাধমূলক কার্যক্রম আর দেখতে চান না।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা জানান, রাসেলের বিরুদ্ধে এলাকায় সাধারণ মানুষকে ভয়ভীতি দেখানো, উসকানিমূলক তৎপরতা এবং শান্তিশৃঙ্খলা বিনষ্টের জন্য গোপন বৈঠকের অভিযোগ রয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে ঘটনার পেছনের মূল পরিকল্পনাকারী এবং অর্থদাতাদের শনাক্ত করতে পুলিশ কাজ করছে। আদালতে তাঁকে হাজির করার পর মামলার স্বার্থে রিমান্ডের আবেদন জানানো হতে পারে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে পুলিশের হাতে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য এসেছে, যা পরবর্তী তদন্তে কাজে দেবে।
সীমান্তবর্তী এলাকা দামুড়হুদায় যেকোনো অপরাধের বিস্তার রোধ করতে থানা পুলিশ দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা কঠোর নিরাপত্তা বলয় গড়ে তুলেছে। উপজেলার প্রধান প্রধান সড়ক ও গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোতে নিয়মিত টহল বাড়ানো হয়েছে। পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, এলাকায় শান্তি বিনষ্টের কোনো অপচেষ্টা সহ্য করা হবে না। সন্ত্রাসবিরোধী আইনের আওতায় চলমান এই সাঁড়াশি অভিযান অব্যাহত থাকবে এবং অপরাধী যেই হোক না কেন, তাকে আইনের মুখোমুখি হতে হবে।
















