সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম লিটারে বাড়ল ২০ টাকা: বিপাকে সাধারণ মানুষ

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

এক ধাক্কায় সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়াল সরকার। রোববার রাতে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে এই সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়। ওই রাত ১২টা থেকেই নতুন এই দর কার্যকর হয়েছে। নতুন দাম অনুযায়ী, ভোক্তা পর্যায়ে প্রতি লিটার ডিজেল ১৩৫ টাকা, পেট্রল ১৬০ টাকা, অকটেন ১৬৫ টাকা এবং কেরোসিন ১৫৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর যখন মূল্যস্ফীতির প্রবল চাপ, ঠিক তখনই এমন সিদ্ধান্তে বাজারে জিনিসপত্রের দাম আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

এর আগে গত এপ্রিল ও জুন মাসেও জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছিল। গত ১৮ এপ্রিল সরকার ডিজেলের দাম লিটারে ১৫ টাকা বাড়িয়ে ১১৫ টাকা করেছিল। তখন পেট্রলের দাম ১৯ টাকা বাড়িয়ে ১৩৫ টাকা, অকটেনের দাম ২০ টাকা বাড়িয়ে ১৪০ টাকা এবং কেরোসিনের দাম ১৮ টাকা বাড়িয়ে ১৩০ টাকা করা হয়। এরপর জুন মাসে পেট্রল, অকটেন ও কেরোসিনের দাম আরও ৫ টাকা করে বাড়ানো হয়েছিল। রোববারের নতুন সিদ্ধান্তের আগপর্যন্ত বাজারে ডিজেল ১১৫ টাকা, পেট্রল ১৪০ টাকা, অকটেন ১৪৫ টাকা এবং কেরোসিন ১৩৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছিল। মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে ডিজেল ও কেরোসিনের দাম লিটারে বাড়ল ২০ টাকা এবং পেট্রল ও অকটেনে বাড়ল ২০ টাকা।

দেশে বর্তমানে মূল্যস্ফীতির হার ৮%-এর বেশি। এমন পরিস্থিতিতে তেলের দাম বাড়ানোয় মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় অনেক বেড়ে যাবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম বলেন, সরকার এর আগেই বিদ্যুতের দাম বাড়িয়েছে। এখন বাড়াল জ্বালানি তেলের দাম। এরপর হয়তো গ্যাসের দামও বাড়ানো হবে। ফলে বাজারে সাধারণ মানুষের টিকে থাকা এখন চরম কঠিন হয়ে পড়বে। নিত্যপণ্যের দাম থেকে শুরু করে যাতায়াত খরচ—সবকিছুতেই এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধির প্রসঙ্গ টেনে শামসুল আলম আরও বলেন, সম্প্রতি ১৪ লাখ সরকারি কর্মচারীর বেতন ১০০% থেকে ১৪৪% পর্যন্ত বেড়েছে। কিন্তু দেশের কোটি কোটি সাধারণ মানুষের আয় বাড়েনি, বরং অনেকের আয় কমে গেছে। মানুষের যদি কেনাকাটার সামর্থ্যই না থাকে, তবে সরকার রাজস্ব পাবে কোথা থেকে? তাঁর মতে, তেলের দাম বাড়িয়ে সরকার যে পরিমাণ ভর্তুকি বাঁচাতে চাইছে, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় তার চেয়ে বেশি রাজস্ব হারাতে হবে।

দাম বাড়ানোর বিষয়ে জ্বালানি বিভাগ তাদের বিজ্ঞপ্তিতে এক ভিন্ন যুক্তি তুলে ধরেছে। মন্ত্রণালয় জানায়, মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের কারণে মার্চ মাস থেকে বিশ্ববাজারে সব ধরনের জ্বালানি তেল ও জাহাজভাড়া দ্বিগুণের বেশি বেড়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যারেলপ্রতি তেলের দাম আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে ৯০$ ছাড়িয়ে গেলেও বাংলাদেশ গত ৫ মাস দেশে জ্বালানির দাম বাড়ায়নি। তবে দীর্ঘদিন ধরে এই বিপুল আর্থিক ক্ষতি টানা সরকারের পক্ষে আর সম্ভব হচ্ছিল না।

বিজ্ঞপ্তিতে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) হিসাব দিয়ে বলা হয়, আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্যবৃদ্ধির কারণে গত মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত ছয় মাসে বিপিসির লোকসান হয়েছে প্রায় ২২,৮৭৬ কোটি টাকা। বিশ্ববাজারের বর্তমান দর অনুযায়ী শুধু ডিজেলে বিপিসির লিটারপ্রতি লোকসান হচ্ছিল প্রায় ৮৯ টাকা। দিনে সংস্থাটির ক্ষতি হচ্ছিল প্রায় ১০৯ কোটি টাকা। এই ধারা বজায় থাকলে শুধু ডিজেল থেকেই বছরে প্রায় ৪০,০০০ কোটি টাকা লোকসান গুনতে হতো। এখন লিটারে ২০ টাকা বাড়ানোর ফলে বছরে বিপিসির ক্ষতি অন্তত ১০,০০০ কোটি টাকা কমবে।

জ্বালানি বিভাগ আরও জানায়, প্রতিবেশী দেশগুলোতে তেলের দাম বেশি হওয়ায় সীমান্ত দিয়ে তেল পাচারের বড় ঝুঁকি তৈরি হয়েছিল। বর্তমানে ভারতের কলকাতায় প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ১৩৫ টাকা, মিয়ানমারে ১৬৫ টাকা, নেপালে ১৬১ টাকা, থাইল্যান্ডে ১৫১ টাকা, পাকিস্তানে ১৮৫ টাকা এবং শ্রীলঙ্কায় ১৭৯ টাকা। দামের বিশাল পার্থক্যের সুযোগে দেশে তেল পাচার হচ্ছিল। এর আগে ২০২২ সালের আগস্টেও সরকার একলাফে ডিজেলের দাম ৩৪ টাকা বাড়িয়ে ১১৪ টাকা করেছিল, যা নিয়ে দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়। পরে অবশ্য সমালোচনার মুখে দাম ৫ টাকা কমানো হয়েছিল। এবারও তেলের দাম বাড়ায় পরিবহনভাড়া ও কৃষিসহ সামগ্রিক উৎপাদন খরচ বাড়বে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।

সম্পর্কিত নিবন্ধ