আসন্ন শারদীয় দুর্গাপূজা শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে উদযাপনের লক্ষ্যে ঝিনাইদহের শৈলকুপায় সার্বিক নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে এক গুরুত্বপূর্ণ মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) শৈলকুপা থানা প্রাঙ্গণে এই মতবিনিময় সভার আয়োজন করে স্থানীয় থানা পুলিশ। পূজা উপলক্ষে যেকোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা এড়াতে এবং প্রতিটি মণ্ডপে ভক্ত ও সাধারণ দর্শনার্থীদের সর্বোচ্চ সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পুলিশ প্রশাসন সব ধরনের আগাম প্রস্তুতি গ্রহণ করছে।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন ঝিনাইদহের পুলিশ সুপার মিয়া মোহাম্মদ আশিস বিন হাসান। শৈলকুপা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. হুমায়ুন কবির মোল্লার সভাপতিত্বে এ সভায় উপজেলার ১৪টি ইউনিয়ন ও ১টি পৌরসভার পূজা উদযাপন কমিটির শীর্ষ নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া স্থানীয় সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, সাংবাদিক ও বিভিন্ন স্তরের গণ্যমান্য ব্যক্তিরা অংশ নেন। বক্তারা বলেন, শৈলকুপার দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য বজায় রেখে সব সম্প্রদায়ের মানুষ পারস্পরিক সৌহার্দ্য নিয়েই এই উৎসব সম্পন্ন করবেন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে পুলিশ সুপার মিয়া মোহাম্মদ আশিস বিন হাসান বলেন, ধর্মীয় সম্প্রীতি বিনষ্ট করার যেকোনো অপচেষ্টা পুলিশ শক্ত হাতে দমন করবে। তিনি পূজা সংশ্লিষ্ট সবাইকে শতভাগ (১০০%) সতর্ক থাকার তাগিদ দেন। পুলিশ সুপার জানান, এবার শৈলকুপার পূজামণ্ডপগুলোতে জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে তিন স্তরের নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা হবে। পাশাপাশি কোনো গুজবে কান না দিয়ে সন্দেহজনক কিছু দেখলেই তাৎক্ষণিকভাবে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ নম্বরে অথবা স্থানীয় থানার নির্দিষ্ট ফোন নম্বরে জানানোর জন্য তিনি সকলের প্রতি আহ্বান জানান।
সভায় জানানো হয়, চলতি বছর শৈলকুপা উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় প্রায় ১২৫টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা আয়োজনের জোর প্রস্তুতি চলছে। এর মধ্যে প্রায় ২৫% থেকে ৩০% মণ্ডপকে সংবেদনশীল হিসেবে চিহ্নিত করে সেখানে বাড়তি পুলিশ ও আনসার সদস্য মোতায়েন রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে। প্রতিটি পূজামণ্ডপের প্রবেশমুখে এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থানে নিজস্ব উদ্যোগে অন্তত ৪ থেকে ৮টি সিসিটিভি ক্যামেরা বসাতে বলা হয়েছে। এছাড়া গভীর রাত পর্যন্ত প্রতিটি মণ্ডপে পূজা কমিটির নিজস্ব স্বেচ্ছাসেবকদের পালাক্রমে পাহারা দেওয়ার বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
পূজার সার্বিক ব্যবস্থাপনায় অর্থের অপচয় রোধ এবং মণ্ডপগুলোর সুষ্ঠু পরিচালনার বিষয়েও মতবিনিময় হয়। পূজা উদযাপন পরিষদের নেতারা জানান, বিভিন্ন মণ্ডপে প্রায় ৫০ হাজার টাকা থেকে শুরু করে কয়েক লাখ টাকার বাজেট নিয়ে প্রতিমা ও মণ্ডপ সাজানো হচ্ছে। স্থানীয় কয়েকটি মণ্ডপে প্রবাসী ভক্তদের পক্ষ থেকে ৫০০ থেকে ১০০০ ডলার ($) সমমূল্যের অনুদানও এসেছে বলে নেতারা উল্লেখ করেন। প্রশাসন থেকে জানানো হয়, ভক্তদের অনুদান যাতে যথাযথভাবে কাজে লাগানো হয়, সেদিকে নজর রাখতে হবে। কোনো ধরনের চাঁদা দাবি বা জোরজবরদস্তির অভিযোগ পেলে পুলিশ তাৎক্ষণিক কঠোর ব্যবস্থা নেবে।
পূজা উদযাপন পরিষদের প্রতিনিধিরা নির্বিঘ্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং যাতায়াতের রাস্তাগুলো দ্রুত সংস্কারের দাবি জানান। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর বিদ্যুতের লোডশেডিং শূন্যের (০%) কোঠায় নামিয়ে আনার বিষয়ে স্থানীয় বিদ্যুৎ সমিতির কর্মকর্তাদের অনুরোধ করা হয়। একই সঙ্গে পরিবেশ ও শব্দদূষণ কমাতে রাত ১০টার পর উচ্চশব্দে মাইক কিংবা সাউন্ডবক্স বাজানো থেকে বিরত থাকার জন্য মণ্ডপ কমিটিকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিসর্জনের শোভাযাত্রায় অতিরিক্ত উন্মাদনা বা বিশৃঙ্খলা ঠেকাতে বিশেষ ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চালু থাকবে।
সভাপতির বক্তব্যে শৈলকুপা থানার ওসি মো. হুমায়ুন কবির মোল্লা বলেন, পূজা চলাকালে পুলিশ সদস্যরা সার্বক্ষণিক মাঠে দায়িত্ব পালন করবেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচার ঠেকাতে পুলিশের বিশেষ সাইবার টিম সার্বক্ষণিক নজর রাখছে। তিনি বলেন, পুলিশ জনগণের সেবক হিসেবে কাজ করছে এবং পূজার দিনগুলোতে যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি মোকাবিলায় থানা পুলিশ দ্রুত ব্যবস্থা নেবে। তিনি তরুণ সমাজ ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের প্রতিটি পাড়া-মহল্লায় সম্প্রীতির পরিবেশ ধরে রাখার আহ্বান জানান।
সবশেষে উপস্থিত পূজা কমিটির নেতৃবৃন্দ প্রশাসনের ইতিবাচক পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়ে পূর্ণ সহযোগিতার আশ্বাস দেন। পূজা শুরুর দিন থেকে বিজয়া দশমীর বিসর্জন পর্যন্ত সার্বিক পরিস্থিতি নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখতে একটি সমন্বয় সেল গঠনের সিদ্ধান্ত হয়। স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, কোনো ধরনের বৈষম্য ছাড়াই সব নাগরিক যাতে নিরাপদে উৎসব পালন করতে পারেন, সেই পরিবেশ নিশ্চিত করা হবে। সভা শেষে অংশগ্রহণকারী ব্যক্তিরা আশা প্রকাশ করেন, পারস্পরিক সহযোগিতার মধ্য দিয়েই এবার শৈলকুপায় একটি চমৎকার দুর্গাপূজা সম্পন্ন হবে।
















