চুয়াডাঙ্গা জেলার দামুড়হুদা উপজেলার হাউলী ইউনিয়নের তারিনপুর গ্রামে বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে লাগা আগুনে একটি পরিবারের সাজানো সংসার চোখের পলকে ছাই হয়ে গেছে। শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) দিবাগত রাত আনুমানিক ২:০০ টার দিকে স্থানীয় বাসিন্দা সোনাজুলের বসতবাড়িতে এই দুর্ঘটনা ঘটে। আগুনে ঘরের ভেতর থাকা সমস্ত আসবাবপত্র, রেফ্রিজারেটর, মূল্যবান কাপড়চোপড় ও খাদ্যসামগ্রী পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। গভীর রাতে এমন আকস্মিক অগ্নিকাণ্ডে পরিবারটির সহায়-সম্বল বলতে আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। সব হারিয়ে পরিবারটির সদস্যরা এখন চরম দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। তবে পরম করুণাময়ের কৃপায় ঘরের ঘুমন্ত সদস্যরা দ্রুত বাইরে বেরিয়ে আসতে পারায় কোনো প্রাণহানি ঘটেনি।
প্রত্যক্ষদর্শী ও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার সূত্রে জানা যায়, শনিবার সারাদিনের কাজকর্ম শেষে রাতে পরিবারের সবাইকে নিয়ে ঘুমিয়ে পড়েন সোনাজুল। রাত আনুমানিক ২:০০ টার দিকে হঠাৎ করেই ঘরের ভেতরের বৈদ্যুতিক তারে বিকট শব্দে শর্টসার্কিট হয়। মুহূর্তের মধ্যেই সেই স্ফুলিঙ্গ থেকে ঘরের দাহ্য পদার্থ ও বিছানাপত্রে আগুন লেগে যায়। চারপাশের তীব্র ধোঁয়া ও উত্তাপে পরিবারের সদস্যদের ঘুম ভেঙে যায়। আগুনের লেলিহান শিখা দেখে তারা কোনো কিছু না ভেবে কেবল পরনের কাপড়ে ঘর থেকে বাইরে ছুটে বের হন। ততক্ষণে আগুনের তীব্রতা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে পুরো ঘরটিকে গ্রাস করে নেয়।
মাঝরাতে আগুনের আলো আর পরিবারের লোকজনের আর্তচিৎকারে গ্রামবাসীর ঘুম ভেঙে যায়। বিপদের কথা শুনে মুহূর্তেই ছুটে আসেন পাড়া-প্রতিবেশীরা। বিশেষ করে এলাকার সাহসী যুবকরা নিজেদের উদ্যোগে এগিয়ে এসে শ্যালো ইঞ্জিন ও পানির পাম্প চালু করেন। হাতে বালতি আর মুখে আগুন নেভানোর তাগিদ নিয়ে সবাই একযোগে কাজ করেন। তারা দ্রুত পানি ছিটিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার সর্বাত্মক চেষ্টা চালান। স্থানীয়দের প্রায় ১ ঘণ্টার অক্লান্ত পরিশ্রমে আগুন চারপাশের অন্য বাড়িগুলোতে ছড়াতে পারেনি। গ্রামবাসীদের দ্রুত তৎপরতার কারণে আশপাশের অন্তত ৮০% ঘরবাড়ি আগুনের বড় ধরনের ঝুঁকি থেকে রক্ষা পায়।
এদিকে আগুন লাগার খবর পেয়ে দর্শনা ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের একটি দল দ্রুত দুর্ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা স্থানীয়দের সহায়তায় দ্রুত পাইপ বসিয়ে আগুনের অবশিষ্টাংশ পুরোপুরি নেভানোর কাজ শুরু করেন। প্রায় ৩০ মিনিট চেষ্টার পর আগুন সম্পূর্ণ নির্বাপণ ও শীতলীকরণ প্রক্রিয়া শেষ হয়। ততক্ষণে আগুনে পুড়ে ঘরের কাঠ, টিন ও যাবতীয় মালামাল ছাইয়ে পরিণত হয়। ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত করেছেন যে, ঘরের ত্রুটিপূর্ণ বৈদ্যুতিক তারের শর্টসার্কিট থেকেই আগুনের সূত্রপাত ঘটেছিল।
এই অগ্নিকাণ্ডে পরিবারটির আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ অপূরণীয়। সোনাজুল জানান, তাদের ঘরে থাকা একটি নতুন ফ্রিজ, সারা বছরের খোরাকির জন্য রাখা ধান-চাল, নগদ জমানো প্রায় ৫০,০০০ টাকা এবং পরিবারের সদস্যদের গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র সব পুড়ে গেছে। স্থানীয়দের হিসাব অনুযায়ী, এই অগ্নিকাণ্ডে পরিবারটির প্রায় ৫ থেকে ৬ লাখ টাকার সমপরিমাণ মালামাল ধ্বংস হয়েছে, যা বর্তমান আন্তর্জাতিক মুদ্রা অনুযায়ী প্রায় $৪,৫০০ ডলারের সমান। সহায়-সম্বল হারিয়ে পরিবারের ১০০% সম্পদ এখন এক নিমেষেই ধূলিসাৎ হয়ে গেছে। ঘরের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি হিসেবে সোনাজুল এখন কীভাবে এই বিপুল অঙ্কের ক্ষতি কাটিয়ে উঠবেন, তা ভেবে পাচ্ছেন না।
বসতভিটায় দাঁড়িয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন ক্ষতিগ্রস্ত সোনাজুল। আহাজারি করতে করতে তিনি বলেন, কত কষ্ট করে দিনমজুরি দিয়ে একটু একটু করে সংসারের জিনিসপত্র গুছিয়েছিলাম। এক রাতের আগুনে আমার সবকিছু শেষ হয়ে গেল। এখন আমার আর মাথা গোঁজার ঠাঁই নেই, পরিবারের সদস্যদের মুখে খাবার তুলে দেওয়ার মতো কোনো পথও খোলা নেই। বর্তমানে স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে খোলা আকাশের নিচে নিদারুণ কষ্টে দিন কাটাচ্ছে অসহায় পরিবারটি। প্রতিবেশী ও স্বজনরা তাদের তাৎক্ষণিকভাবে কিছু খাবার দিয়ে সহায়তা করলেও স্থায়ী আশ্রয়ের সংকট এখনো কাটেনি।
ঘটনার খবর পেয়ে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের সদস্যরা ও গণ্যমান্য ব্যক্তিরা দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। তারা ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান। স্থানীয় সচেতন মহল মনে করেন, এই মুহূর্তে প্রশাসন এগিয়ে না এলে সোনাজুলের পক্ষে নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানো অসম্ভব। তাই উপজেলা প্রশাসন ও স্থানীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির কাছে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারটিকে জরুরি ভিত্তিতে ঢেউটিন, খাদ্যসামগ্রী এবং আর্থিক পুনর্বাসন সহায়তা প্রদানের জোর দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। তারা দ্রুত সহায়তা দিয়ে পরিবারটির মুখে হাসি ফিরিয়ে আনার আহ্বান জানান।
















