জাতীয় রাজনীতির মৌলিক দাবি ও তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের মতো আঞ্চলিক ইস্যু সামনে রেখে আজ শনিবার রংপুর অভিমুখে লংমার্চ শুরু করেছে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় ঐক্য। গত ৫ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম অভিমুখে লংমার্চের সফলতার পর এটি এই বিরোধী জোটের দ্বিতীয় বড় কর্মসূচি। রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু হওয়া এই দীর্ঘ যাত্রায় উত্তরাঞ্চলের লাখ লাখ সাধারণ মানুষকে সম্পৃক্ত করার বড় পরিকল্পনা নিয়েছে তারা। উত্তরবঙ্গের দীর্ঘদিনের প্রাণের দাবি তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের বিষয়টি যুক্ত করায় সাধারণ মানুষের মাঝে এই কর্মসূচি নিয়ে বাড়তি আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
রংপুর অঞ্চলকে বেছে নেওয়ার পেছনে জোটের রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ বেশ জোরালো। সদ্য সমাপ্ত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রংপুর বিভাগের ৩৩টি সংসদীয় আসনের মধ্যে জামায়াতে ইসলামী একাই ১৭টি এবং তাদের মিত্র জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ২টি আসনে জয়লাভ করে। ফলে ৩৩টি আসনের মধ্যে জোটগতভাবে ১৯টি আসন অর্থাৎ প্রায় ৫৮% আসনেই তাদের একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। অন্যদিকে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি জিতেছিল ১৩টি আসনে এবং ১টি আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী বিজয়ী হন। নির্বাচনী ফলাফলের এই শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েই বিরোধী জোট এবার উত্তরের মাটিতে নিজেদের প্রভাব আরও সুদৃঢ় করতে মাঠে নেমেছে।
চট্টগ্রামের লংমার্চে জোটটি ছয় দফা দাবি তুলে ধরেছিল, যার মধ্যে ছিল গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার বিচার, বিদ্যুৎ-জ্বালানি সংকট নিরসন এবং নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বগতি রোধ। তবে রংপুরমুখী এই কর্মসূচিতে যোগ হয়েছে আরও দুটি নতুন দাবি—দুর্নীতি, দখলবাজি ও চাঁদাবাজি বন্ধ এবং বহুল প্রতীক্ষিত তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন। উত্তরবঙ্গের খরা ও বন্যা সমস্যা নিরসনে এই মেগা প্রকল্পে আন্তর্জাতিক সংস্থা ও উন্নয়ন সহযোগীদের কোটি কোটি ডলার ($)-এর আর্থিক সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি থাকলেও বিগত সরকারগুলো তা বাস্তবায়নে ব্যর্থ হয়েছে। জোটের নেতারা মনে করেন, উত্তর জনপদের কৃষি ও জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে তিস্তা প্রকল্প এখন গণদাবিতে পরিণত হয়েছে।
পূর্বনির্ধারিত সূচি অনুযায়ী আজ সকাল সাতটায় রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে উদ্বোধনী সমাবেশের মধ্য দিয়ে এই যাত্রা শুরু হয়। সকাল আটটায় গাড়িবহর রংপুরের উদ্দেশে রওনা দেয়। পথে গাজীপুরের ভোগরা বাইপাস, টাঙ্গাইলের নগর জালফৈ বাইপাস, সিরাজগঞ্জের হাটিকুমরুল মোড়, বগুড়ার মাটিডালি বিমান মোড় এবং গাইবান্ধার পলাশবাড়ী চৌমাথায় একাধিক পথসভা অনুষ্ঠিত হবে। সবশেষে সন্ধ্যা ৭টায় রংপুর জিলা স্কুল মাঠে সমাপনী জনসভা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। ঢাকা থেকে রওয়ানা হওয়া বহরে অন্তত এক হাজারেরও বেশি গাড়ি রয়েছে এবং স্থানীয় জেলাগুলো থেকে পথে পথে আরও গাড়ি যুক্ত হচ্ছে।
সমাপনী মহাসমাবেশে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেবেন বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। গতকাল মগবাজারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে লংমার্চ বাস্তবায়ন কমিটির আহ্বায়ক ও জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার সরকারকে কোনো ধরনের উসকানিমূলক আচরণ বা পথিমধ্যে বাধা সৃষ্টি না করার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, কর্মসূচি হবে শতভাগ (১০০%) শান্তিপূর্ণ। কোনো দিক থেকে আক্রমণ এলে প্রতিশোধ না নিয়ে কর্মসূচি সফল করাই হবে মূল লক্ষ্য। উসকানির মুখে দলের নেতাকর্মীদের সর্বোচ্চ ধৈর্য ও সংযম প্রদর্শনের কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
হাইওয়ে সড়কে এই বিশাল গাড়িবহরের কারণে সাধারণ যাত্রীদের সাময়িক চলাচলে যে বিঘ্ন ঘটতে পারে, সে জন্য জোটের পক্ষ থেকে আগেই আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করা হয়েছে। সড়কের শৃঙ্খলা বজায় রাখতে দলটির নিজস্ব স্বেচ্ছাসেবকরা ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে সহযোগিতা করবেন। আয়োজকরা আশা করছেন, রংপুর জিলা স্কুল মাঠের সমাপনী সমাবেশে ৩ থেকে ৫ লাখ মানুষের রেকর্ড জমায়েত হবে। রাস্তার দুই পাশে দাঁড়িয়ে সাধারণ মানুষ এই কর্মসূচিকে স্বাগত জানাবে বলে তাঁরা আশাবাদী।
রংপুরের এই কর্মসূচির পর আগামী ৩১ অক্টোবর খুলনা এবং ২১ নভেম্বর সিলেট অভিমুখে লংমার্চ করার চূড়ান্ত তারিখ ঘোষণা করেছে ১১-দলীয় ঐক্য। বিভাগীয় পর্যায়ের এই চারটি লংমার্চ শেষ করার পর রাজধানীতে একটি বিশাল মহাসমাবেশের ডাক দেবে বিরোধী এই জোট। জুলাই সনদ মেনে সাংবিধানিক সংস্কার কার্যকর করতে সরকারকে চাপে রাখাই তাদের মূল রাজনৈতিক কৌশল। নতুন বাংলাদেশে জনগণের ভোটাধিকার ও মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় এই আন্দোলনকে তারা শেষ পর্যন্ত এগিয়ে নিতে চায়।
















