১৭২ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ ও ৭৩৭ কোটি টাকার সন্দেহজনক লেনদেন: সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের বিরুদ্ধে দুদকের অভিযোগপত্র অনুমোদন

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হক ও তাঁর পরিবারের তিন সদস্যের বিরুদ্ধে ১৭২ কোটি ২৪ লাখ টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং ৭৩৭ কোটি টাকার বেশি অস্বাভাবিক ব্যাংক লেনদেনের প্রমাণ পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। দীর্ঘ অনুসন্ধান শেষে বুধবার এই চার আসামির বিরুদ্ধে আদালতে আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র দাখিলের অনুমোদন দিয়েছে সংস্থাটি। ক্ষমতার অপব্যবহার, ঘুষ গ্রহণ ও অর্থ পাচারের অভিযোগে তাঁদের বিরুদ্ধে করা মামলার তদন্তে চাঞ্চল্যকর এসব আর্থিক অনিয়ম খুঁজে পায় দুদক। আদালতে অভিযোগপত্রটি দাখিলের মাধ্যমে আলোচিত এই মামলার আনুষ্ঠানিক বিচার প্রক্রিয়া শুরু হতে যাচ্ছে।

মামলায় আনিসুল হকের পাশাপাশি অভিযুক্ত অন্য তিন আসামি হলেন তাঁর ছোট ভাইয়ের স্ত্রী জেবুন্নেসা বেগম হক কলি, ভাগনে শেখ মো. ইফতেখারুল ইসলাম এবং তাঁর ‘কাজিন’ হিসেবে পরিচিত মোহাম্মদ ইকবাল। রাজধানীর সেগুনবাগিচায় দুদক কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে দুদক সচিব মো. সাইদুর রহমান খান জানান, এই তিনজন সাবেক আইনমন্ত্রীকে সরাসরি অবৈধ সম্পদ অর্জনে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সহায়তা করেছেন। মন্ত্রীর ঘুষ ও দুর্নীতির মাধ্যমে উপার্জিত কালো টাকা নিজেদের নামে স্থানান্তর ও আড়াল করতেই এই স্বজনদের কাজে লাগিয়েছিলেন তিনি।

দুদকের তদন্ত অনুযায়ী, আনিসুল হকের বৈধ ও গ্রহণযোগ্য আয়ের পরিমাণ মাত্র ১৩ কোটি ২৭ লাখ ৯৫ হাজার ২৩৮ টাকা। এর বিপরীতে তাঁর পারিবারিক ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৪ কোটি ৬৬ লাখ ৫৪ হাজার ২৯৮ টাকা। ফলে পারিবারিক যাবতীয় খরচ বাদে তাঁর নিট সঞ্চয় থাকার কথা ছিল ৮ কোটি ৬১ লাখ ৪০ হাজার ৯৪০ টাকা। অথচ দুদক তদন্তে দেখেছে, আনিসুল হক ও তাঁর তিন স্বজনের নামে রয়েছে মোট ১৮০ কোটি ৮৫ লাখ ৭৩ হাজার ৮৮১ টাকার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ। বৈধ সঞ্চয় বাদ দিলে তাঁদের মোট অর্জিত সম্পদের প্রায় ৯৫% অংশই সম্পূর্ণ অবৈধ ও জ্ঞাত আয়ের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ।

দুদক সূত্র জানায়, ২০০০ সালের ৩০ জুন থেকে ২০২৬ সালের ১৯ জুলাই পর্যন্ত সময়ে ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে এসব অঢেল সম্পদ গড়ে তোলেন আসামিরা। এর মধ্যে আনিসুল হকের নিজের নামেই রয়েছে ৯৬ কোটি ৮০ লাখ ৬৬ হাজার ৮৮০ টাকার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ। অন্যদিকে অবৈধ আয়ের নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে তিন আত্মীয়ের নামে রেখেছেন আরও ৮৪ কোটি ৫ লাখ ৭ হাজার ১ টাকার সম্পদ। এসব অবৈধ সম্পদের তালিকায় রাজধানীতে বিলাসবহুল ফ্ল্যাট, মূল্যবান জমি এবং বিভিন্ন লাভজনক ব্যবসায়িক অংশীদারি খুঁজে পেয়েছে দুদক।

সম্পদ অর্জনের পাশাপাশি আসামিদের ব্যাংক হিসাবেও চোখ কপালে ওঠার মতো লেনদেনের তথ্য পেয়েছে কমিশন। আনিসুল হক ও তাঁর স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নামে থাকা ২৩টি ব্যাংক হিসাবে এই অস্বাভাবিক লেনদেন চলে। এসব হিসাবে মোট ৩৭৫ কোটি ৫০ লাখ ৯৯ হাজার ৪৫২ টাকা জমা হয় এবং পরবর্তীতে ৩৬১ কোটি ৭৩ লাখ ২৭ হাজার ১২৯ টাকা তুলে নেওয়া হয়। সব মিলিয়ে মোট লেনদেনের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭৩৭ কোটি ২৪ লাখ ২৬ হাজার ৫৮১ টাকা, যা মার্কিন মুদ্রায় প্রায় $৬১ মিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ। দুদকের দাবি, ঘুষের অর্থ গোপন ও বিদেশে পাচারের উদ্দেশ্যে এসব ব্যাংক হিসাব ব্যবহার করেছেন আসামিরা।

এর আগে ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি আনিসুল হকের বিরুদ্ধে মামলাটি দায়ের করেছিলেন দুদকের উপপরিচালক মো. জাহাঙ্গীর আলম। সে সময় প্রাথমিক এজাহারে ১৪৬ কোটি ১৯ লাখ টাকার অবৈধ সম্পদ এবং ২৯টি ব্যাংক হিসাবে প্রায় ৬৬৬ কোটি টাকা লেনদেনের অভিযোগ এনেছিল দুদক। তবে তদন্ত কর্মকর্তা বিভিন্ন ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট রেজিস্ট্রি অফিস থেকে প্রামাণ্য নথি সংগ্রহ করে নিবিড় তদন্ত শেষ করেন। এতে দেখা যায়, অবৈধ সম্পদ ও সন্দেহজনক লেনদেন—উভয় ক্ষেত্রেই অর্থের পরিমাণ এজাহারের চেয়ে উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।

অনুমোদিত এই অভিযোগপত্রে আসামিদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন এবং মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের কঠোর সব ধারা যুক্ত করেছে দুদক। এছাড়া অপরাধে সরাসরি সহায়তা ও প্ররোচনা দেওয়ার দায়ে দণ্ডবিধির ১০৯ ধারাও আনা হয়েছে। খুব দ্রুতই বিচারিক আদালতে এই অভিযোগপত্র জমা দেবে কমিশন। সাবেক একজন আইনমন্ত্রীর দফতরে বসে ক্ষমতার অপব্যবহার করে এমন পাহাড়সম দুর্নীতির চিত্র প্রকাশ পাওয়ায় সারা দেশের মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ